চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলীয় বেড়িবাঁধসংলগ্ন শঙ্খ নদীর তীর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকায় উপকূলীয় বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সাগরপাড়ে বসবাস করছেন হাজার হাজার মানুষ।
এদিকে, গত মঙ্গলবার থেকে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন অন্তত ২০ হাজার মানুষ। কিছু কিছু মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে এলেও অধিকাংশ মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
জানা গেছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় খানখানাবাদের রায়ছটা এবং ইশ্বর বাবুরহাটসংলগ্ন এলাকায় চলছে অবাধে বালু উত্তোলন। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। প্রশাসন অভিযান চালিয়ে বালু জব্দ করে নিলাম দিলেও স্থানীয়দের দাবি, সেখানে পুনরায় বালু উত্তোলন চলছেই। ফলে এলাকাজুড়ে হঠাৎ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোর মানুষজন।
বঙ্গোপসাগরের জোয়ারভাটার প্রভাবে প্রবল ঢেউ এবং গত কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিপাতে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ভাঙনের ফলে বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় উপকূলবাসী আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। খানখানাবাদ, সাধনপুর, বাহারছড়া, সরল, গন্ডামারা, শেখেরখীল ও ছনুয়া এলাকার বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে। বিশেষ করে খানখানাবাদ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রোসাঙ্গীপাড়া এলাকার বেড়িবাঁধটি মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানান খানখানাবাদ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম।
এদিকে, উপকূলবাসীকে সুরক্ষা দিতে সরকার বাঁশখালীতে ৪৯৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৬ দশমিক ২১০ কিলোমিটার সমুদ্র তীর প্রতিরক্ষা ও বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ কাজে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পূর্ব বাঁশখালীর অন্তত ২০টি ছড়া-খাল জবরদখলে থাকায় অপরিকল্পিতভাবে পানিপ্রবাহের কারণে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, পুকুর ও গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপকূলীয় খানখানাবাদ এলাকায় বেড়িবাঁধের একাংশ ধসে পড়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোয় বাড়ছে ধসের শঙ্কা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার ছনুয়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, চাম্বল, শীলকূপ, সরল, গন্ডামারা, কাথারিয়া, বাহারছড়া, পুকুরিয়া, খানখানাবাদ এবং পৌরসভার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল। বৈলছড়ি ইউনিয়নের একাধিক এলাকাও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও গ্রামীণ সড়ক ভেঙে গেছে আবার কোথাও যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে আউশ ধানের বীজতলা, মৌসুমি সবজির ক্ষেত এবং বিভিন্ন ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। মাছের ঘের ও পুকুর প্লাবিত হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৎস্যচাষিরাও। নদী ও খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে শেখেরখীল ইউনিয়নের পশ্চিমাঞ্চলে। নাপোড়া শেখেরখীল এলাকায় সড়ক ভেঙে যাওয়ায় বন্যার পানি হিন্দুপাড়াসহ আশপাশের গ্রামে ঢুকে কয়েকশ বসতঘর প্লাবিত হয়েছে। সরকার বাজারের উত্তর পাশের নোয়াপাড়া, মোহাব্বত আলী পাড়া, কাচারিপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে।
অন্যদিকে ছনুয়া ইউনিয়নের পূর্বাঞ্চলে প্রায় এক হাজার পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্লুইসগেটে মাছ ধরার জাল বসিয়ে রাখায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।
পুঁইছড়ি ইউনিয়নের হারুনের দোকানসংলগ্ন ব্রিক সলিং সড়ক ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ রত্নপুর দীঘিরপাড়ায় সাতটি পরিবারের একমাত্র চলাচলের সড়ক কাদা ও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী, বৃদ্ধা, নারী ও শিশুদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বিদ্যুৎহীনতার ত্রিমুখী সংকটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বাঁশখালীর জনজীবন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুহুল আমীন আমার দেশকে বলেন, বিভিন্ন স্থানে পানিবন্দি থাকা মানুষগুলোকে সার্বক্ষণিক নজরে রাখা হয়েছে এবং তাদের যথাযথ সহায়তার জন্য চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছনুয়ায় কিছু মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে প্রায় ৫০০ জনের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বানভাসি মানুষের মধ্যে সাড়ে ২৪ টন চাল বিতরণ করা হবে বলে জানান ইউএনও রুহুল আমীন।







