ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের ইকইছড়া বাজারে গত ১ ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্য রহস্য নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ও ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার দীর্ঘ সময় পর আদালতে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং বাদীপক্ষের অভিযোগের বিপরীতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিযুক্ত নেতাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য পুরো ঘটনাটিকে এক রহস্যময় ও সংঘাতময় মোড়ে দাঁড় করিয়েছে।
জানা গেছে, সোমবার (২ নভেম্বর) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটির এজাহার জমা দেন নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আবু হানিফ মোল্লা। বিচারক এজাহারটি নবীনগর থানার ওসি নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
মামলায় জেলা ও উপজেলা বিএনপির ১১ জন শীর্ষ নেতার নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।
আসামিরা হলেন—উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম, নবীনগর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন মাইনু এবং জেলা বিএনপির সদস্য ও উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. হযরত আলী।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত ১ ফেব্রুয়ারি রাতে নাটঘর ইউনিয়নের ইকইছড়া বাজারে শতাধিক সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আসামিদের নেতৃত্বে মহড়া দেয়। পরে তারা পেট্রোল ঢেলে স্থানীয় বিএনপির কার্যালয়সহ তিনটি মুদি দোকান ও একটি ওষুধের দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তবে অনুসন্ধানে বাদীর অভিযোগ ও স্থানীয়দের বক্তব্য থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঘটনাটি সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাজনিত এবং বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন জানান, বাজারের পাশেই আমার বাড়ি। আগুন লাগার পর হানিফ মোল্লা সবার আগে সেখানে আসেন, তার ডাকাডাকিতেই আমরা আসি। কারেন্ট থেকেই বাজারে আগুন লেগেছিল। সে সময় উপস্থিত লোকজনের সামনে আবু হানিফ মোল্লা নিজেই এই কথা বলেছিলেন। তিনি আমাদের বলেছিলেন, ‘তোরা যাইস না, এটা কারেন্টের আগুন’।
ইকইছড়া গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মুরব্বি আবুল কালাম বলেন, আমাদের গ্রামে কোনো রাজনৈতিক কোন্দল বা হানাহানি নেই, সবাই মিলেমিশে বসবাস করি। নির্বাচনের সময়ও সব পক্ষের লোকজন একসঙ্গে বসে চা খায়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই হয়েছে। কেউ ইচ্ছে করে আগুন লাগিয়েছে—এমনটি ভাবার কোনো অবকাশ নেই।
স্থানীয় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সেখানে বিএনপির একটি নির্বাচনি অফিস ছিল, যেখানে আলগা তার দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাই বলেছেন যে অফিস থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। এখানে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক কোন্দল নেই। রাতে প্রশাসনের লোকজন আসার পরও তাদের এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছিল। বিদ্যুৎ থেকেই আগুন লেগেছে, এটাই আমরা জানি।
এ বিষয়ে মামলার বাদী আবু হানিফ মোল্লা মুঠোফোনে জানান, ঘটনার পরদিন থানায়, ইউএনও অফিস এবং সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচন ও রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে অভিযোগের খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। ঘটনার পর কয়েক মাস পার হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি আদালতে মামলা দায়ের করতে বাধ্য হয়েছেন।
এলাকার লোকজন আগুনের সূত্রপাত বিদ্যুৎ থেকে হয়েছে বলে জানিয়েছেন’—এমন প্রশ্নের জবাবে আবু হানিফ বলেন, বিদ্যুৎ থেকে লেগেছে কি না, তদন্ত করলেই আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গেছে, আগুন লাগার পরদিন আবু হানিফ মোল্লা নবীনগর থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছিলেন। তবে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সরেজমিন তদন্ত করে নাশকতার কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় সেই অভিযোগের আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে মামলাটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও সাজানো দাবি করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মামলার ১ নম্বর আসামি হযরত আলী বলেন, আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, অজস্র হামলা-মামলার শিকার হয়েছি। একটি সুবিধাবাদী মহল আমাদের সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে এবং প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই মিথ্যা মামলা সাজিয়েছে। তাদের সাজানো মামলা নবীনগরবাসী ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কি আর কোনো কাজ নেই যে রসুল্লাবাদ গ্রাম থেকে গিয়ে ইকইছড়া বাজারে রাত ১টায় আগুন ধরাব? এই বানোয়াট মামলার মাধ্যমে নবীনগরের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে এক নোংরা প্রতিহিংসার রাজনীতির সূচনা করা হলো।
অপর আসামি সাবেক মেয়র মাইনুদ্দিন আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমি নবীনগর পৌরসভার প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলাম। আসন্ন পৌর নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি কুচক্রী মহল আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে আমাকে এই মিথ্যা মামলায় জড়াল। আমি চাই, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসুক, যাতে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন।
উপজেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান মুকুল বলেন, আগুন লেগেছে নাটঘর ইউনিয়নের ইকইছড়া বাজারে, আর আসামি করা হয়েছে অন্য এলাকার মানুষকে। ইকইছড়া গ্রামের কোনো আসামি নেই। মামলার প্রধান সাক্ষীও আরেক ইউনিয়নের বাসিন্দা, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই। এতেই বোঝা যায়, এই মামলার কোনো সত্যতা নেই।
এ বিষয়ে নবীনগর থানার ওসি মোরশেদ আলম চৌধুরী বুধবার সকালে মুঠোফোনে জানান, এখনো মামলার নথি থানায় আসেনি। নথি এলে তদন্তের পর মন্তব্য করতে পারব। তদন্ত না করে আগে কিছু বলা যাবে না।







