৪৯তম বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. জসিম উদ্দীন। তবে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন তিনি। ফলে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত গেজেটে তার নামও আসেনি।
বাদ পড়ার পর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের ফেসবুক আইডিতে দুটি পোস্ট দিয়েছেন জসিম। প্রথম পোস্টে তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে প্রকাশ্যে আত্মহুতির ঘোষণা দিয়েছেন।
জসিম উদ্দীন তার দ্বিতীয় পোস্টে লিখেছেন, ‘সময়টা ২০১০ সালের ডিসেম্বর, তিউনিসিয়ার যুবক মোহাম্মদ বোয়াজিজি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নে শেষ পর্যন্ত শরীরে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহুতি দিলেন। তার জীবনের বিনিময়ে পুরো আরব বিশ্বে বেশ পরিবর্তন এসেছিল। আজ থেকে সে আমার আইডল।’
এরপর তিনি একটি ‘ঘোষণা’ লেখেন। তাতে উল্লেখ করা হয়, ‘ঘোষণা: ৪৯ তম বিসিএস-এর জয়েনিং (১২ অক্টোবর) দিন সন্ধ্যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে আমিও শরীরে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহুতি দেওয়ার ঘোষণা দিলাম।’
‘আমার জীবনের বিনিময়ে হয়তো কিছুই অর্জিত হবে না। কিন্তু ভেরিফিকেশান নামক হয়রানি এবং গেজেটের দাসত্ব থেকে এ জাতির মেধাবী সন্তানরা মুক্ত হোক সেই কামনা রইলো।’
এর আগে দেওয়া আরেক পোস্টে জসিম লেখেন, ‘৪৯ তম বিসিএসে ক্যাডার হিসাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলাম। কিন্তু এ রাষ্ট্রযন্ত্র আমাকে ১০ মাস ২০ দিনের ভেরিফিকেশন ও রিভেরিফিকেশন শেষে গেজেট দেয়নি! আমার বাবা-মায়ের চিকিৎসা খরচ, বোনদের পড়াশোনার দায়িত্ব এ রাষ্ট্র কখনো নেবে না আমি জানি। কিন্তু একই সাথে আমাকেও গেজেট দেবে না?’
তিনি আরও লেখেন, ‘সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে আর আট-দশজন চাকরিপ্রত্যাশীদের মতো আমিও খুশি হয়েছিলাম; পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসাবে স্বপ্ন বুনেছিলাম। কখনও কোনো হামলা-মামলা, অন্যায়, অবিচারে যুক্ত ছিলাম না। কিন্তু শিকার হয়েছি। আমাকে যারা কাছ থেকে চেনেন, তারা জানেন আমি কেমন এবং আমার সার্বিক অবস্থা!’
জসিম আরও লেখেন, ‘সরকার বাহাদুর আপনাকে বলছি, কারো দয়ায় কিংবা সুপারিশে চাকরিটা পাইনি। নিজের মেধা এবং যোগ্যতায় পেয়েছিলাম, যেটা কেড়ে নিয়ে আমার প্রতি চরম অন্যায়, অবিচার করেছেন!’
‘আপনি সরকার বাহাদুর হলেও আমার বৃদ্ধ-অসুস্থ বাবার সামনে দাঁড়ানোর সৎ সাহস আপনার নেই। কারণ আমাকে অন্যায়, অযৌক্তিকভাবে বাদ দিয়েছেন। চাকরিটা আমার ভীষণ প্রয়োজন ছিল, ভীষণ’ যোগ করেন জসিম উদ্দীন।
সামনে আসছে জসিমের ছাত্রলীগে পদ!
এদিকে, জসিমের পোস্ট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে এজিএস পদে নির্বাচন করা তানভীর আল হাদী মায়েদ একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে ছাত্রলীগের প্যাডে ঢাবির একটি হল কমিটির ছবি ও জসিমের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট যুক্ত করেছেন তিনি।
মায়েদ তাতে লিখেছেন, ‘বিসিএসে নাকি দলীকরণ করা হয়েছে! দলীয়করণ করার ফলে ছাত্রদল বা বিএনপি সমমনা কে বা কারা বা কতজন চাকরি পেল? দলীয়করণ করে পরীক্ষা-ভাইবা ফেস না করে কে বা কারা চাকরির জন্য বাছাইকৃত হলো? বাংলার বোয়াজিজিকে নাকি দলীয়করণ করে বাছাই প্রক্রিয়ার নামে বাদ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদকও বাছাইয়ে বাদ পড়লে নাকি দলীয়করণ হয়। তাহলে বাছাইটা করবে কি?’
পোস্টের সঙ্গে থাকা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ছাত্রলীগের কবি জসীম উদ্দীন হলের কমিটিতে মো. জসিম উদ্দীন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়েছেন।
ছাত্রলীগ ছেড়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন, তাতেও রক্ষা নেই!
এদিকে, জসিম উদ্দীন ২০২২ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেসময় ছাত্রলীগ ছেড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে মাঠে নামেন বলে দাবি করেছেন তিনি। ৩ জুলাই শাহবাগে কোটাবিরোধী আন্দোলনে নিজের ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছেন জসিম উদ্দীন।
কোটাবিরোধী আন্দোলনে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে দেওয়া পোস্টে জসিম উদ্দীন লেখেন, ‘জুলাই ২০২৪-এ শাহবাগ স্কয়ারে থাকা অযোগ্যতা? ২০২২ সালে হল ছাত্রলীগে পোস্টেড ছিলাম, সেটা আমার অযোগ্যতা? ফৌজদারি মামলা কিংবা মামলা হামলায় জড়িত ছিলাম না, সেটা আমার অযোগ্যতা?’
অবশ্য তার এ পোস্টের জবাবও দিয়েছেন ছাত্রদল নেতা তানভীর আল হাদী মায়েদ। জবাবে তিনি লেখেন, ‘এটা ভেরিফিকেশন পাস করার ল্যান্ডমার্ক না। এটা বুঝতে হবে।’
জসিম উদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। এ বিভাগ থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। জসিম ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সদস্য ছিলেন।
এদিকে, শুধু জসিম উদ্দীন নয়, ৪৯তম বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করেও ৫৭ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী গেজেটে বাদ পড়েছেন। তাদের অনেকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না বলে দাবি করছেন। তাদের বাদ দেওয়ার কারণ জানতে চাইছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও বিরোধীদলের বিভিন্ন পদ-পদবিতে থাকা প্রার্থীদের গেজেটে রাখা হয়নি।







