ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে দেশের অন্তত ১৮টি উপজেলা কার্যালয়ে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর, বিক্ষোভ ও সরকারি দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার চরম অরাজক ঘটনা ঘটেছে।
গাইবান্ধা, নাটোর, পাবনা, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, যশোর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ইউএনওদের অবরুদ্ধ করা, গালাগাল করা এবং এমনকি প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে।
প্রকাশিত ফ্যামিলি কার্ড শুমারির চূড়ান্ত ফলে যোগ্য প্রার্থীদের তালিকাভুক্ত করায় উল্টো ‘আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পুনর্বাসন’ এবং ‘জামায়াত-শিবিরের তোষণ’ হয়েছে বলে অবাস্তব দাবি তুলেছে নিয়োগবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা।
গাইবান্ধার চার উপজেলায় হামলা ও তালা: গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ফল প্রকাশের পর উপজেলা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাণ্ডব চালিয়ে ইউএনও কার্যালয়ের জানালা, চেয়ার ও সরকারি আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। সুন্দরগঞ্জে ইউএনও কার্যালয় ও সমাজসেবা কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুরে সড়ক অবরোধ করে জেলা প্রশাসক ও ইউএনওর অপসারণ দাবি করে উস্কানিমূলক স্লোগান দেওয়া হয়।
নাটোর ও রাজশাহীতে ‘জবাই’ করার হুমকি: নাটোরের বাগাতিপাড়া ও লালপুরে ইউএনও কার্যালয়ে সরাসরি হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে ছাত্রদলের সশস্ত্র নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে রাজশাহীর বাগমারায় তারেক জিয়া প্রজন্ম দলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে ইউএনওকে ‘জবাই কর’ বলে চরম আক্রমণাত্মক স্লোগান দেওয়া হয়।
নোয়াখালীতে ইউএনওকে উলঙ্গ করে পেটানোর হুমকি: নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে যুবদল নেতা কামরুল হাসান নিসান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও প্রশাসক কায়েসুর রহমানকে নজিরবিহীনভাবে ‘উলঙ্গ করে পেটানোর’ প্রকাশ্য হুমকি দেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
অন্যান্য স্থানে তাণ্ডব: পাবনার সাঁথিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, কুষ্টিয়ার কুমারখালী, ময়মনসিংহের গৌরীপুর, যশোরের ঝিকরগাছা ও কেশবপুর, রাজশাহীর গোদাগাড়ী এবং মৌলভীবাজারের রাজনগরেও ইউএনও অফিস ঘেরাও, মূল ফটকে তালা ঝোলানো ও স্মারকলিপির নামে প্রশাসনিক কাজে চরম বিঘ্ন ঘটানো হয়েছে।
ঘটনাগুলোর পর দেশের বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত ইউএনও এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইউএনও জানান, সরকারের সুনির্দিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক ক্যাডাররা নিজেদের দলীয় পরিচয়ধারী অযোগ্য লোকদের নিয়োগ দিতে প্রকাশ্য ও গোপন চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। তাদের সেই বেআইনি আবদার না মানায় পরিকল্পিতভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই তাণ্ডব চালানো হয়েছে।
প্রশাসন ক্যাডারদের শীর্ষ সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’-এর মহাসচিব মো. বাবুল মিঞা এ বিষয়ে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা সব ধরনের সহিংসতা ও ভাঙচুরের কঠোর নিন্দা জানাই। সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে সবাই নাগরিক শিষ্টাচার ও নির্ধারিত আইনি সীমারেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন বলে আশা করি। নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে মাঠ প্রশাসনকে সহযোগিতা করাই সবার দায়িত্ব।”
রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের চাপের মুখে মাঠ প্রশাসনের স্বাধীন কাজকর্ম ব্যাহত হওয়া এবং সরাসরি সরকারি সম্পত্তি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টরা।







