দেশের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এখন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রোববার (১৪ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘গণমাধ্যম ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নিজের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, গতকাল রাতে আমার জ্বর হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তবুও আপনাদের দেখতে ভালো লাগে। বয়সের কারণে নয়, মনের টান থেকেই এখানে এসেছি।
গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মিডিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মিডিয়া এখন আর শুধু মিডিয়া নেই। অনেক ক্ষেত্রেই তা বিজনেস হাউজের প্রতিনিধি হয়ে গেছে। চাটুকারিতা কাকে বলে, তা সাম্প্রতিক সময়ের কিছু গণমাধ্যমের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। আমরা আশা করি, সাংবাদিক সমাজ স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
জিয়াউর রহমানকে নিয়ে গবেষণার ঘাটতির কথা তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, জিয়াউর রহমান সম্পর্কে যতটা গবেষণা হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। এটি ইতিহাসের প্রতিই এক ধরনের অবিচার। তরুণ গবেষকদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা। আমি একজন বাংলাদেশি—এই পরিচয়কে তিনি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমি মনে করি, এটি তার অন্যতম বড় অবদান।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন গণতন্ত্রই সবচেয়ে উত্তম শাসনব্যবস্থা। ১৯৭৫-পরবর্তী অস্থির সময়ে তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একত্রিত করার উদ্যোগ নেন।
বিএনপির আদর্শিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা রেজিমেন্টের দল নয়। এটি একটি উদারপন্থি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, যা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে।
অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, রেমিট্যান্স অর্থনীতি, তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি গবেষণা ও উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তার দূরদর্শী উদ্যোগ দেশের উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে।
কুষ্টিয়ার একটি সফরের স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ। তিনি একটি গ্রামের বৃদ্ধার কাছ থেকে পানি ও পেয়ারা চাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এই ছোট্ট ঘটনাই প্রমাণ করে, তিনি মানুষের কতটা কাছের ছিলেন।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তার জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, লাখো মানুষের নীরব অশ্রু ও উপস্থিতি প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তার অবস্থান কত গভীর ছিল।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার দূরদর্শিতা আজও স্মরণীয়।
সমালোচনার জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, জিয়াউর রহমানকে নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে, কিন্তু ইতিহাস ইতোমধ্যেই তাকে সম্মানিত করেছে। ইতিহাসে তার অবস্থান অমলিন।
তিনি আরও বলেন, একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের যে স্বপ্ন বিএনপি ধারণ করে, তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, ডিউজের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, সহসভাপতি রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ।







