নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের একটি চত্বরের নাম গত কয়েক বছরে তিনবার পরিবর্তন করা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ‘মুজিব চত্বর’ থেকে শুরু করে পরে ‘ওসমান হাদি চত্বর’ এবং সর্বশেষ ‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চত্বর’ নামকরণ করা হয়েছে স্থানটির। গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকালে নতুন নাম ঘোষণা করা হয়। একই স্থানে বারবার নাম পরিবর্তনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যখন যে দল বা সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের পছন্দের নামে চত্বরটির নামকরণ করা হয়। ২০২০ সালে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর স্মারক হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল ও মুজিব চত্বর’ স্থাপন করা হয়।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক তন্ময় দাসের সভাপতিত্বে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে চত্বরটি উদ্বোধন করেন নোয়াখালী-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদির গায়েবানা জানাজা শেষে চত্বরটির নাম ‘ওসমান হাদি চত্বর’ ঘোষণা করেন জুলাই সর্বদলীয় ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরা। এ সময় নোয়াখালী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হারুনুর রশীদ আজাদসহ জামায়াত, ছাত্রশিবির ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিকালে নোয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে চত্বরটির নতুন নাম ঘোষণা করা হয়। স্থানটির নাম রাখা হয়েছে ‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চত্বর’। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নামকরণের ঘোষণা দেন। একই স্থানে বারবার নাম পরিবর্তনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকের মতে, নতুন কোনো স্থাপনা বা চত্বর নির্মাণ না করে বিদ্যমান স্থাপনার নাম বারবার পরিবর্তন করা সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার পরিপন্থী।
এদিকে নোয়াখালী জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন খান তার ফেসবুক পোস্টে চত্বরটির নাম পরিবর্তন নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর কোনো স্থাপনার নামফলক মুছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে চত্বর করার ইচ্ছা দলটির নেই। বিএনপি সস্তা রাজনীতি করে না। নোয়াখালীতে কেউ নিজ উদ্যোগে এমন কিছু করলে তার দায় বিএনপি নেবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নুরুল আমিন খান আরও লেখেন, ‘ক্ষমতায় থাকলে এক নামে আর ক্ষমতায় না থাকলে অন্য নামে চত্বর করার সংস্কৃতির অবসান হওয়া উচিত।’
চত্বরটির নামকরণে সরকারি অনুমতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন নোয়াখালী জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক রবিউল হাসান পলাশ। তিনি বলেন, ‘কোনো চত্বরের নামকরণ করতে সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়। মুজিব চত্বর করার সময় তা মানা হয়েছিল কি না জানি না। ঠিক একইভাবে হাদি চত্বর করার সময় সরকারি অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা-ও জানা নেই। এখন শহীদ জিয়া চত্বর করতে জেলা প্রশাসকের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদই ভালো বলতে পারবেন।’
‘যারা হাদির ছবি সরিয়ে জিয়াউর রহমানের ছবি টাঙিয়েছে, তারা তার আদর্শ ধারণ করে না’
চত্বরটির নাম পরিবর্তন নিয়ে সমালোচনা করেছেন নোয়াখালী জেলা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক মিনহাজুল ইসলাম। ঢাকা ডায়েরিকে তিনি বলেন, ‘পূর্বে মুজিব চত্বর, এরপর হাদি চত্বর করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এটি দখল করে নাম দেওয়া হলো জিয়াউর রহমান চত্বর। যারা হাদির ছবি সরিয়ে জিয়াউর রহমানের ছবি টাঙিয়েছে, তারা জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে না। এদের আদর্শ দখলদারিত্ব আর ভোগবাদী।’
নোয়াখালী জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আশরাফ উদ্দিন আসিফ বলেন, ‘হাদি এবং জিয়াউর রহমানকে মুখোমুখি দাঁড় করানো রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার স্বরূপ। এই কাজে রাজনৈতিক সৌন্দর্যের ব্যাঘাত ঘটেছে। আমরা বিএনপির ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জিয়াউর রহমানের ছবি-সংবলিত ব্যানার সরিয়ে নিয়েছি।’
অন্যদিকে, চত্বরটির নাম পরিবর্তনের পেছনে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নোয়াখালী শহর শিবিরের সেক্রেটারি মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের উপলব্ধি, নোয়াখালী মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কাজটি করেছে। বিএনপির নির্বাচিত এমপিসহ অনেকেই এই ব্যাপারে জানে না।’







