নিকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে কটাক্ষ করার অভিযোগ ওঠার পর নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব। পাশাপাশি তার কোর্স থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে এ বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
লাইভে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তাসনিম সিরাজ মাহবুব। তিনি বলেন, “আমি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি। সেদিন ক্লাসে দরজার বাঁ পাশে আরও দুজন ছাত্রীর সঙ্গে একজন শিক্ষার্থী বসেছিলেন, যাঁর চোখসহ পুরো মুখমণ্ডল ঢাকা ছিল। তার চোখ দেখতে না পাওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারছিলাম না।”
তিনি আরও বলেন, “চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করতে না পারায় ওই শিক্ষার্থী আমার বক্তব্য কীভাবে গ্রহণ করছেন এবং শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে কীভাবে অংশ নিচ্ছেন, তা বুঝতেও আমার অসুবিধা হচ্ছিল। এতে পাঠদানের সময় আমি স্বস্তি অনুভব করছিলাম না। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনা থেকেই আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলি।”
কুরআনের আয়াত টেনে তিনি বলেন, “আমি সূরা আন-নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে বর্ণিত শালীনতা, সৌন্দর্য প্রদর্শন সীমিত রাখা এবং শরীর আবৃত করার নির্দেশের উল্লেখ করি। ক্লাসে বোরখা পরা অন্য দুই শিক্ষার্থীর উদাহরণ দিয়ে বলি, আল-কোরআনের অনুবাদ পড়ে আমার বোঝাপড়া অনুযায়ী, শরীরের গঠন স্পষ্ট না হয় এমন শালীন পোশাক পরেও মুখমণ্ডল দৃশ্যমান রাখা যায়। মুখমণ্ডল খোলা রাখা জায়েজ এমন ধর্মীয় ব্যাখ্যার কথাও তাকে বলি। নিজের হজ পালনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ইহরাম অবস্থায় নারীদের নেকাব না পরার বিষয়ে হাদিসের কথাও আলোচনা করি।”
তিনি বলেন, “এই পুরো আলোচনার মধ্যে তার পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো কথাই হয়নি। আমি কেবল চোখ দেখতে না পাওয়ার কারণে স্বস্তিবোধ করছি না—এ কথা বলার পর তিনি ক্লাস থেকে চলে যান। তার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। তবে তার পক্ষে কথা বলা অন্য একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় হয়। তিনি পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতার কথা বললে আমি শিক্ষার্থীদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারা এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পাঠদানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলি।”
তিনি আরও বলেন, “একজন শিক্ষকের পক্ষে যেকোনো শিক্ষার্থীর পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর যোগাযোগে ব্যত্যয় ঘটলে শিক্ষাদানে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, তা বোঝানোই ছিল আমার বক্তব্যের মূল বিষয়।”
আরও অনেক শিক্ষার্থীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সেদিন একই ক্লাসে আরও অনেক শিক্ষার্থী শুধু হিজাব এবং হিজাবের সঙ্গে বোরখা পরে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মুখমণ্ডল দৃশ্যমান থাকায়, ক্ষেত্রবিশেষে শুধু চোখ দেখা যাওয়ায়, তাদের চিনতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি। তাদের কাউকে পোশাক সম্পর্কে কিছু বলিওনি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে বলেছিলাম, অন্য শিক্ষার্থীরাও বোরখা ও হিজাব পরে এসেছেন এবং একইভাবে পর্দা করা যায়। এতে পর্দা সম্পর্কে ইসলাম ধর্মের যে নির্দেশ রয়েছে, তা পুরোপুরিভাবে পালিত হয়। সমগ্র মুখমণ্ডলের সঙ্গে তার চোখও ঢাকা থাকলে তাকে কীভাবে চিনব, সেই প্রশ্নও করেছিলাম।”
তিনি বলেন, “আমি তাকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করিনি। পোশাক পরিবর্তন করতে, নেকাব খুলতে কিংবা ক্লাস ত্যাগ করতেও নির্দেশ দিইনি। ধর্মীয় পোশাকের কারণে তাকে কোনো শাস্তি দিইনি বা ভবিষ্যতে আমার ক্লাসে আসতেও নিষেধ করিনি। আমার কথা ছিল চোখ ঢেকে রাখা নিয়ে, হিজাব, বোরখা বা পর্দার বিরুদ্ধে নয়। ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার পর কয়েকজন শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে কথা বলেন। তাদের কাছ থেকে জানতে পারি, ওই ছাত্রী সম্ভবত আমার কথায় ব্যথিত হয়েছেন এবং সে কারণেই ক্লাস ছেড়ে চলে গেছেন। তখন উপস্থিত শিক্ষার্থীদের বলি, আমি কখনোই চাই না আমার কথায় কেউ কষ্ট পাক। তোমরা যখন বলছ, সে কষ্ট পেয়ে চলে গেছে, আমি তাকে সরি বলতে চাই।”
দুঃখ প্রকাশ করার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “তার কাছে সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করার জন্য সহপাঠীদের মাধ্যমে তাকে বিভাগের ভেতরে খোঁজ করাই। যখন জানতে পারি, তিনি ২০৮১ নম্বর কক্ষে বসে আছেন, তখন আরেকজন ছাত্রীর মাধ্যমে তাকে তিনবার ডেকে পাঠাই। করিডরে দাঁড়িয়ে প্রায় ১০ মিনিট তার জন্য অপেক্ষা করি। তিনি পাশের কক্ষে অবস্থান করলেও বারবার খবর পাঠানোর পরও আমার সঙ্গে কথা বলতে ওই কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেননি। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তার কাছে সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “একই সময়ে পরিবারের একজন গুরুতর অসুস্থ সদস্যের অস্ত্রোপচারের কারণে আমাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হয়। এই পারিবারিক সংকটের মধ্যেই জানতে পারি, আমার বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যা আমার বলা কথার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য যথাযথভাবে তুলে ধরছে না। বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।”
ব্যাখ্যা উপস্থাপনের সুযোগ না পাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আরও জানতে পারি, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ইংরেজি বিভাগ আমার বক্তব্য গ্রহণ না করেই আমার সব কোর্স অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করেছে। আমার ব্যাখ্যা উপস্থাপনের সুযোগ পাওয়ার আগেই এমন সিদ্ধান্তে আমি মর্মাহত হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আমার অনুরোধ, অভিযোগগুলোর বিষয়ে আমার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। সভার বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। এই প্রক্রিয়ায় আমি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”
তিনি বলেন, “ঘটনার পর বেনামি ফোন, ইমেইল, আপত্তিকর বার্তা ও হুমকি আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীসহ সবার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং হুমকি ও হয়রানি প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করছি। আমি বিশ্বাস করি, শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ স্থান হওয়া প্রয়োজন। পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে তা ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান রেখে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া উচিত।”
এদিকে ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী বলেন, “আমরা যখন ইমার্জেন্সি একাডেমিক কমিটি মিটিং কল করেছি, ডিপার্টমেন্টের সব শিক্ষককেই সেখানে ডাকা হয়েছে, কারণ একাডেমিক কমিটির সদস্য হচ্ছেন সব শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন নিয়মে চলে, তা সবার জানা প্রয়োজন; একাডেমিক কমিটি মিটিং ছাড়া কোনো ডিপার্টমেন্ট, চেয়ারপারসন কিংবা একক কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।”
তিনি বলেন, “আমরা ইমার্জেন্সি মিটিং ডাকার পর, মিটিং শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিট আগে উনি রেসপন্ড করে জানান যে উনি অসুস্থ। কিন্তু ততক্ষণে শিক্ষার্থীরা বাইরে অপেক্ষা করছিল এবং তাদের লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল। আমাদের মোট ১৯ জন শিক্ষকের মধ্যে উনি সহ মাত্র ৩ জন শিক্ষক বাদে বাকি ১৬ জন শিক্ষকই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। এমনকি অনেকে ইউজিসির কাজ, প্রজেক্টের কাজ বা সাত কলেজের ভাইভা ছেড়েও মিটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন; কারণ বিভাগে একটি এক্সট্রিমলি ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন তৈরি হয়েছিল।”
পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “মিটিংয়ে উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে ৬-৭ জন শিক্ষক ঘটনার দিন ও পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলেন এবং পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছিলেন। মিটিংয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠানো চিঠিটি পড়ে শোনানো হয় এবং তাদের দাবির প্রেক্ষিতেই উনাকে বরাদ্দ দেওয়া একমাত্র কোর্সটি রিয়্যাসাইন করে অন্য একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমানে আমাদের বিভাগে মারাত্মক শিক্ষক সংকট চলছে, যেখানে একজন শিক্ষককে তিনটি করে কোর্স নিতে হচ্ছে; ফলে আরেকজন শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া কতটা চাপের, তা অনুমেয়। এটি আমাদের কারোরই কাম্য ছিল না, তবে উদ্ভূত পুরো পরিস্থিতিটিই অত্যন্ত দুঃখজনক।”







