মানুষের মৃত্যুর পর শোকের ব্যানার টাঙানোর ঘটনা পুরান ঢাকায় পরিচিত। তবে এবার একটি কুকুরের মৃত্যুতে লালবাগের বিজিবি ২ নম্বর গেট এলাকায় দেখা গেছে ব্যতিক্রমী দৃশ্য। দেয়ালে দেয়ালে টাঙানো হয়েছে টমির ছবি দিয়ে তৈরি শোক ব্যানার। কারও ঘরের পোষা প্রাণী না হয়েও প্রায় এক দশক ধরে এলাকার মানুষের সঙ্গে তার গড়ে উঠেছিল গভীর সম্পর্ক। সে হয়ে উঠেছিল পুরো মহল্লার আপনজন। তার মৃত্যুতে বিষণ্ন হয়ে পড়েছে এলাকাটি।
গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় টমি। ছোটবেলা থেকেই তার দেখাশোনা করতেন স্থানীয় দোকানি নিজাম উদ্দিন। তিনি বলেন, টমিকে কখনো আটকে রাখেননি। সে সবার সঙ্গে মিশে থাকতে পছন্দ করত। তাই টমি শুধু তার নয়, পুরো এলাকার ছিল। মানুষের ভালোবাসাই ছিল টমির সবচেয়ে বড় পাওয়া।
লালবাগের সরু গলি, দোকানপাট ও চায়ের আড্ডার সঙ্গে মিশে ছিল টমির জীবন। কেউ ডাকলে কাছে যেত, কেউ খাবার দিলে খেত। কোন দোকানের সামনে বসবে, কোন গলি দিয়ে ঘুরবে—এসব ছিল মহল্লাবাসীর প্রতিদিনের পরিচিত দৃশ্য। বছরের পর বছর তাকে দেখতে দেখতে ছোট-বড় সবার কাছে সে হয়ে উঠেছিল পরিবারেরই একজনের মতো। শিশুরাও তাকে ভালোবাসত, নিয়মিত তার খোঁজ নিত।
স্থানীয় সেলুন দোকানি শাহজাদা বলেন, টমি পুরো এলাকায় জনপ্রিয় ছিল। দেখতে অনেকটা বাঘের মতো হওয়ায় তাকে দেখলে অনেকেই থেমে যেতেন। স্বভাবেও ছিল চঞ্চল ও খেলাপ্রিয়। নিজাম উদ্দিনকে না পেলে অনেক সময় তার দোকানে এসে বসত। টমির সঙ্গে এলাকার মানুষের সম্পর্কটা ছিল অনেকটা পরিবারের সদস্যের মতো।
স্থানীয় বাসিন্দা সায়েম হোসেন বলেন, টমিকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। এলাকায় সে খুবই পরিচিত ছিল। রাস্তা খালি থাকলে অনেক সময় মানুষকে এগিয়ে দিয়ে আসত। টমি খুব বুদ্ধিমান ছিল, মানুষের অনেক কিছুই বুঝতে পারত। এ কারণেই সে সবার কাছে আলাদা হয়ে উঠেছিল।
অসুস্থ হওয়ার পরও টমিকে একা ছেড়ে দেয়নি মহল্লার মানুষ। এলাকার শিশুরাও তার খোঁজ নিত। খাবার কমে গেলে অনেকে আদর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করতেন। পরে টমির শরীরে টিউমার ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়।
টমির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বদলে যায় মহল্লার চেনা পরিবেশ। দেয়ালে দেয়ালে টাঙানো হয় তার ছবি দিয়ে তৈরি শোক ব্যানার। একটি কুকুরের মৃত্যুতে পুরো মহল্লার এমন শোক প্রকাশ স্থানীয়দের কাছেও ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা।
স্থানীয় বাসিন্দা আশিক বলেন, টমি আমাদের কাছে শুধু একটা কুকুর ছিল না, সে ছিল আমাদের অনেক প্রিয়। তার কথা বলে শেষ করা যাবে না। বছরের পর বছর তাকে দেখেছি, তার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। টমি সারা জীবন আমাদের হৃদয়ে থাকবে।
শেষ বিদায়েও ছিল ব্যতিক্রমী ভালোবাসা। টমিকে গোসল করিয়ে পরিষ্কার কাপড়ে জড়িয়ে শরীরে আতর দেওয়া হয়। পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইরাকি ফিল্ডে। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।
নিজাম উদ্দিন বলেন, জীবিত অবস্থায় মানুষ টমিকে যেভাবে ভালোবাসা দিয়েছে, শেষ সময়েও সেই ভালোবাসার কমতি ছিল না। তাকে গোসল করিয়ে পরিষ্কার কাপড় পরানো হয়েছে, শরীরে আতর দেওয়া হয়েছে। ইরাকি ফিল্ডে নিয়ে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। টমির শেষ বিদায়টা আমাদের কাছে একজন আপনজনকে বিদায় দেওয়ার মতোই ছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, টমি কারও ঘরের পোষা প্রাণী ছিল না। তবু মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে তাকে ছাড়া মহল্লার পরিচিত দৃশ্য যেন অসম্পূর্ণ। কারও কাছে সে ছিল পরিচিত মুখ, কারও কাছে সঙ্গী, আবার কারও কাছে নিঃশব্দ এক আপনজন।







