ছয় মাসে চট্টগ্রামে বন্ধ ৫০ কারখানা, কারণ কী

Post Image

যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপের বাজারেও আধিপত্য হারাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। বড় দুটি বাজার হারিয়ে দিশাহারা অবস্থায় পড়েছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়। কার্যাদেশ না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি কারখানা। চালু থাকা অধিকাংশ কারখানা লো-ক্যাপাসিটিতে অপারেশন চালাচ্ছে।

বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। শ্রমিক নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপের বিভিন্ন বায়িং প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চার হাজার ১১০ কোটি ১৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে গেছে ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ ইউরোর পোশাক।

গত বছরের একই সময়ে ইউরোপে রপ্তানি হয়েছিল এক হাজার ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক। এক বছরের ব্যবধানে অন্যতম বড় এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১৬.৪৩ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ ৪০০ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৭৫ শতাংশ কম।

বড় বাজারগুলোর নিম্নমুখী এই চিত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের শিল্পকারখানায়। এই খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি তেল-গ্যাসের তীব্র অভাবসহ নানামুখী সংকটের কারণে সহসা সুখবর পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন না তারা। এরই মাঝে ছোট-বড় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে অর্ডার না থাকার কারণে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো।

নগরীর পাহাড়তলী এলাকায় আরটিটি টেক্সটাইল কারখানায় অপারেটরের কাজ করতেন শিরিনা বেগম। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, চাকরি করে অতিরিক্ত কাজের টাকাসহ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন পেতাম। এখন বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি, বাচ্চাদের নিয়ে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করাটাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

শিরিনা বলেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে ছেলেমেয়ে নিয়ে অর্থকষ্টে দিন পার করছি। রিকশাচালক স্বামী অসুস্থ হওয়ায় কষ্ট আরো বেড়েছে।

শিরিনার মতো চট্টগ্রামের শান গার্মেন্টস, ওমামা ফ্যাশনসহ বিভিন্ন কারখানার চাকরি হারানো হাজারো শ্রমিক বেকার হয়েছেন। অনেক শ্রমিক তাদের পেশা পরিবর্তন করেছেন। পেশা পরিবর্তন করে এখন অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় কাজ করেন রুবেল। তিনি বলেন, চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন কাজ ছিল না। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দুই মাসেও চালু না হওয়ায় বাধ্য হয়ে এখানে কাজ করছি। পাওনা পরিশোধের বিষয়ে রুবেল বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করেছি। নিয়মানুযায়ী আমরা টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু মালিক আমাদের এক টাকাও দেননি।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাসে বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রামে ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ২৫টি, বাকি ২৫টি সাময়িক বন্ধ রয়েছে। কারখানাগুলোয় কাজ করা সাত হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।

তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে কমপক্ষে ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত কিংবা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। এদের অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের সুপার মাহমুদা বেগম সোনিয়া বলেন, ছাঁটাইকৃত শ্রমিক এবং কারখানা মালিকদের অভিযোগগুলো আমরা বসে সমাধানের চেষ্টা করেছি। কারখানাগুলো বন্ধের কারণ হিসেবে মালিকরা কাঁচামাল সংকট ও বৈশ্বিক কারণকে দায়ী করেছেন। এছাড়া শ্রমিকদের অসদাচরণ ও আর্থিক সংকটের কথাও বলেছেন মালিকরা।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের চট্টগ্রাম জেলার যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান বলেন, শ্রমিকদের কাছ থেকে কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিক ছাঁটাই, জোরপূর্বক চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে। গত ছয় মাসে সেটা আরো বেড়েছে। একটি কারখানায় ১০-১৫ বছর ধরে চাকরি করলেও আইনানুযায়ী শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য পাচ্ছেন না। অনেক সময় বিনা নোটিসে তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের অভিযোগগুলো নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় কারখানা মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করি। কিন্তু বেশিরভাগ অভিযোগের বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে না পারা, অতিরিক্ত কটনভিত্তিক পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যান মেইড ফাইবার বা এমএমএফ পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ খাতে সীমিত সক্ষমতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতিযোগী দেশগুলো। অন্যদিকে ইউরোপের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের কার্যাদেশ হারিয়ে ইউরোপের বাজারে আধিপত্য করছে। এছাড়া ভিয়েতনাম ও ভারত ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে এগিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি দেশের চলমান জ্বালানি সংকট, বন্দর-কাস্টমের প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং লিড টাইমও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে।

এই বিভাগের আরও খবর

সারাদেশ

News Image

ফিলাডেলফিয়ায় বৈশাখী মেলা

সোমবার, ৩০ জুন, ২০২৫

সর্বশেষ খবর

ছয় মাসে চট্টগ্রামে বন্ধ ৫০ কারখানা, কারণ কী

বিশ্ববাজারে কমল স্বর্ণের দাম

লালমনিরহাটে কৃষকদের ধাওয়ায় শর্টগান-ওয়াকিটকি ফেলে পালাল বিএসএফ

বাংলাদেশকে ১০০-তে ৮০ দিলেন হাসান মাহমুদ

এক মাসের ব্যবধানে গোবিপ্রবি ভিসিকে সরিয়ে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া হলো

আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম

মিউজিকসহ আর গান গাইবেন না জামায়াত নেতার ছেলে ঢাবি ছাত্র সালমান

‘শেষ হতা এক্কান, ফিরত চাই আরকান’

সর্বাধিক পঠিত

ঝিনাইদহে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা : আহত ১৩, ভাঙচুর

খুলনায় আ.লীগ কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন ও স্লোগান, ভিডিও ভাইরাল

রমজানে অনলাইনে কুরআন শেখানোর উদ্যোগ শায়খ আহমাদুল্লাহর

ইসলাম কোনো ধর্মের ওপর জোরপূর্বক কিছু চাপিয়ে দেয় না: দেলাওয়ার হোসেন

আমার মেয়ে বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়

ঝিনাইদহে স্বতন্ত্র ও ধানের শীষ সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ

সদ্য বিএনপিতে যোগদান করা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান দেশীয় অস্ত্রসহ আটক

বান্দরবানে গোলাগুলিতে নিহত ১

হাদি হত্যা মামলার প্রতিবেদন ফের পেছাল

চাইনিজ কুঁড়াল-রাম দাসহ যৌথ বাহিনীর হাতে আটক বিএনপি নেতা