মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্থ, ক্ষমতা, পরিচিতি নাকি অন্য কিছুতে? কোরআন মানুষের এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে। সুরা বাইয়্যিনাতে মানুষের ঈমান, ইবাদত, একনিষ্ঠতা, নৈতিকতা এবং পরিণতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। মাত্র আট আয়াতের এই সূরায় একজন মুমিনের জীবন পরিচালনার জন্য গভীর দিকনির্দেশনা রয়েছে।
আল্লাহ বলেন, আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্য থেকে যারা কুফরি করেছে, তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ না আসা পর্যন্ত তারা বিরত থাকেনি। সেই সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসুল, যিনি পবিত্র সহিফা পাঠ করেন। (সুরা বাইয়্যিনা, আয়াত: ১-৩)
এখানে মানুষের জন্য প্রথম শিক্ষা হলো সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তা অস্বীকার করা উচিত নয়। মানুষ অনেক সময় নিজের স্বার্থ, অহংকার কিংবা পূর্বধারণার কারণে সত্যকে গ্রহণ করতে চায় না। অথচ আল্লাহর নির্দেশনা পাওয়ার পর একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো তা গ্রহণ করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা।
সূরাটিতে মানুষের বিভক্তির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও মানুষ মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই মানুষ সঠিক পথে থাকবে এমন নয়। জ্ঞানের সঙ্গে প্রয়োজন আল্লাহভীতি ও সত্যের প্রতি আন্তরিকতা।
সুরা বাইয়্যিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি এসেছে পঞ্চম আয়াতে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে, তার জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ রাখতে, নামাজ কায়েম করতে এবং জাকাত দিতে। আর এটিই সঠিক দ্বীন।
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইবাদতের ক্ষেত্রে লোক দেখানো বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত নয়। নামাজ, দান, সেবা কিংবা অন্য যেকোনো ভালো কাজের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি। মানুষের চোখে বড় হওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত সাফল্য।
এর সঙ্গে নামাজ ও জাকাতের উল্লেখ করে ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনের ভারসাম্যের কথাও বোঝানো হয়েছে। নামাজ মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে শেখায়। আর জাকাত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। অর্থাৎ ইসলামে ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সমাজের অসহায় মানুষের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর সূরায় মুমিনদের পুরস্কারের কথা বলা হয়েছে। যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। (সুরা বাইয়্যিনা, ৭-৮)
এখানে আরেকটি বড় শিক্ষা হলো, শুধু ঈমানের দাবি যথেষ্ট নয়; ঈমানের সঙ্গে সৎকর্মও থাকতে হবে। মানুষের কথা, আচরণ, লেনদেন ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তার ঈমানের প্রভাব প্রকাশ পেতে হবে।
অন্যদিকে সত্য অস্বীকারকারীদের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি এবং সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সুরা বাইয়্যিনা মানুষকে শুধু পরকালের পুরস্কারের আশাই দেয় না, ভুল পথের পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করে।
সুরাটির মূল শিক্ষা হলো, সত্যকে চিনে গ্রহণ করা, আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ থাকা, নামাজ ও জাকাতের গুরুত্ব দেওয়া, ঈমানের সঙ্গে সৎকর্ম করা এবং পরকালের জবাবদিহির কথা মনে রেখে জীবন পরিচালনা করা। দুনিয়ার ব্যস্ত জীবনে এসব শিক্ষা একজন মানুষকে তার প্রকৃত লক্ষ্য মনে রাখতে সাহায্য করতে পারে।







