মা ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। এ সময় নদীতে সব ধরনের জাল ফেলা ও মাছ আহরণ বন্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে শেষ সময়ে তাই চাঁদপুরের বিভিন্ন মাছঘাটে বেড়েছে ইলিশের বেচাকেনা। একই সঙ্গে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ইলিশের দাম।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট, সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া মাছঘাট এবং হরিণা ফেরিঘাট সংলগ্ন ইলিশের আড়ত ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, দুই সপ্তাহ আগে এক কেজি ওজনের ইলিশ যেখানে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে একই আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। নিষেধাজ্ঞার আগে ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে দাম কমার সম্ভাবনাও কম বলে মনে করছেন আড়তদাররা।
বহরিয়া মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, কিছুক্ষণ পরপর জেলেদের নৌকা থেকে ইলিশ আড়তে আসছে। তবে সেখানে বড় আকারের ইলিশের তুলনায় ৫০০ গ্রাম বা তার কম ওজনের মাছই বেশি দেখা গেছে। জেলেদের নিয়ে আসা মাছ আড়তে উঠতে না উঠতেই ক্রেতাদের মধ্যে তা কেনার প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে।
ঘাটটিতে ছোট আকারের ইলিশের হালি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। আর প্রায় ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের প্রতি হালি দাম উঠেছে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত।
বহরিয়া এলাকার জেলে হান্নান গাজী বলেন, “মৌসুমের শেষ দিকে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে আগস্টে নদীতে ইলিশের পরিমাণ অনেক কম ছিল। বর্তমানে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কোনোভাবে নৌকা ও মাছ ধরার খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে।”
বহরিয়া মাছঘাটের আড়তদার মো. ইদ্রিস আলী বলেন, “শেষ সময়ে ইলিশের আমদানি আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা এখনও কম। চাঁদপুরের ইলিশের আলাদা সুনাম থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা এখানে আসছেন।”
হানারচর ইউনিয়নের জেলে নজরুল ইসলাম জানান, “একটি নৌকায় ১০ জন মিলে মাছ ধরেন তারা। রাতে নদীতে গিয়ে সকালে ঘাটে ফিরেছেন। এবার যে পরিমাণ ইলিশ পেয়েছেন, তাতে তাদের খরচ উঠে এসেছে। তবে জালে ময়লা-আবর্জনা আটকে যাওয়ায় ওই দিন আর নদীতে নামতে পারেননি। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে আরও এক-দুই দিন মাছ ধরার সুযোগ হতে পারে বলে জানান তিনি।”
হরিণা মাছঘাটের পাইকারি বিক্রেতা মো. জাহাঙ্গীর ছৈয়াল বলেন, “গত দুই সপ্তাহ ধরে এ ঘাটে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ মণ ইলিশ এসেছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে সরবরাহ কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা এসে ইলিশ কিনলেও তাদের চাহিদা অনুযায়ী মাছ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “এক সপ্তাহ আগেও এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। এখন একই ওজনের ইলিশের দাম বেড়ে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা হয়েছে। ছোট আকারের ইলিশের হালি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত।”
হরিণা ঘাটের বিক্রেতা সিরাজুল ইসলাম ছৈয়াল বলেন, “এ ঘাটে জেলেরা সরাসরি পদ্মা-মেঘনা থেকে মাছ নিয়ে আসেন। ঘাটে মাছ ওঠার পর বরফ দেওয়ার আগেই অনেক সময় ক্রেতারা তা কিনে নেন। সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এ ঘাটে ইলিশের কেনাবেচা চলে।”
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবেবরাত সরকার বলেন, “গত সপ্তাহে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা ভালো থাকলেও চলতি সপ্তাহে তা কমেছে। নিষেধাজ্ঞার আগে তুলনামূলক কম দামে ইলিশ কেনার আশায় অনেক ক্রেতা ঘাটে এলেও চাহিদার তুলনায় মাছ কম থাকায় দাম কমছে না। সরবরাহ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই দাম কিছুটা কমে আসবে।”
চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, “নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ সময়ে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক জেলে নদীতে মাছ ধরায় কম-বেশি ইলিশ পাচ্ছেন। এ বছর ইলিশের গড় আকারও তুলনামূলক বড়।”
তিনি বলেন, “আগামী ২২ দিনের প্রজনন মৌসুম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এর সুফল ভবিষ্যতে জেলেরাই পাবেন। মা ইলিশ রক্ষায় ইতোমধ্যে জেলেদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।”







