চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে নিহত জামাল উদ্দিনকে হত্যার ধরন ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি একটি পরিকল্পিত টার্গেটেড কিলিং। মোটরসাইকেলে করে এসে খুব কাছ থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি চালানো, গলা থেকে মাথা পর্যন্ত ১৩টি গুলির ছিদ্র, হামলার পর মুহূর্তে পালিয়ে যাওয়া- সবকিছু মিলিয়ে তদন্তকারীরা মনে করছেন, হত্যাকারীদের লক্ষ্য ছিল শুধু জামালের মৃত্যু নিশ্চিত করা এবং সেটি তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, এমন ঘনঘন গুলিবর্ষণ এ এলাকায় আগে দেখা যায়নি। আর এ ধরনের হামলা সাধারণত পেশাদার খুনিরাই করে থাকে। ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর দিঘীরপাড় এলাকায়।
এলাকাটি দিনের আলোতে কিছুটা ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যার পর নির্জন হয়ে পড়ে। সেদিনও সন্ধ্যার পরে নিস্তব্ধতার মধ্যেই গ্রিলের পাশে বসে গল্প করছিলেন জামাল উদ্দিন ও তার গ্রামের লোক নাসির উদ্দিন। শহর থেকে আসার পর দুজনেই দিঘীরপাড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সেই মুহূর্তেই একটি মোটরসাইকেল এসে থামে। তিনজন আরোহী দ্রুত নেমে কোনো কথা না বলেই লক্ষ্যভেদী গুলি চালায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ১৩টি গুলি জামালের মাথা ও গলায় লাগে। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, হামলার ধরন পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, খুব কাছ থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এতগুলো গুলির ছিদ্র মাথার ওপরের দিকে পাওয়া গেছে, এতে বোঝা যাচ্ছে, হামলাকারীরা শুধু কাছেই ছিল না, বরং দ্রুত ধারাবাহিকভাবে গুলি চালিয়েছে।
নিহত জামাল উদ্দিন লেলাং গ্রামের মুহাম্মদ ইউসুফের ছেলে। তিনি শহরে একটি গার্মেন্টস ব্যবসা পরিচালনা করতেন। স্থানীয়দের অনেকেই তাকে ব্যবসায়ী হিসেবেই চিনতেন। তবে পুলিশ বলছে, ২০০১ সালের তিনটি হত্যা মামলায় তার নাম ছিল। যদিও সেই মামলাগুলো এখনো নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় রয়েছে।
ফটিকছড়ি জামায়াতের নায়েবে আমীর ইসমাইল গনি বলেন, জামাল ছিলেন তাদের সক্রিয় কর্মী। তিনি মনে করেন, এই হত্যা পরিকল্পিত এবং এর পেছনে সুগভীর উদ্দেশ্য আছে। তিনি বলেন, এমন নৃশংস হামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসারই বহিঃপ্রকাশ। তাদের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্যও মিলছে একই ধরনের। লেলাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সারোয়ার হোসেন বলেন, হামলাকারীরা অত্যন্ত সংগঠিত ছিল। অন্ধকারে এসে মুহূর্তের মধ্যে গুলি করে চলে যায়।
তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের ডেটা বিশ্লেষণ করছেন। যদিও ঘটনাস্থলটিতে সরাসরি ক্যামেরা নেই, তবে আশপাশের বাড়িগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। মোটরসাইকেলটি কোন দিক থেকে এসেছে এবং কোন রুট দিয়ে বের হয়েছে-এটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি হামলার আগে ও পরে এলাকার মোবাইল টাওয়ারে সক্রিয় নম্বরগুলোর তথ্য তুলনা করা হচ্ছে।
পুলিশ ধারণা করছে, হামলাকারীরা এলাকায় আগে থেকেই নজরদারি চালাচ্ছিল এবং কারও কাছ থেকে জামালের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিল। সেই ‘ইনসাইডার’ কে-তা এখন তদন্তের বড় প্রশ্ন।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিহতের গ্রামের লোকজন সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা শোকে ভেঙে পড়েছেন। তারা বলছেন, জামাল কারো সঙ্গে এমন বিরোধে জড়িত ছিলেন না যে তাকে এতটা নির্মমভাবে হত্যা করা হবে।
পুলিশ বলছে, তারা হত্যাকারীদের শনাক্তের খুব কাছাকাছি এবং অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তার সম্ভব।







