গাজীপুরে এক মাদরাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী শিশুকে যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।
সেই দিন মাদরাসায় মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছিল, সেটার বর্ণনা দিয়েছে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বডিবিল্ডার শাহজালাল রুমির স্ত্রী মালিহা।
এক পডকাস্ট অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন শাহজালাল রুমি। ওই সময় দর্শকের অনুরোধে লাইভ অনুষ্ঠান চলাকালে নিজ স্ত্রীকে ফোন দিয়ে ঘটনার বর্ণনা দিতে বলেন তিনি
ওই দিন মাদারাসায় শিশুর সঙ্গে যা হয়েছিল বাড়ি ফিরে তার মাকে বলেছিল মেয়ে, সেই ঘটনার বর্ণনা দেন মা মালিহা।
ফোনে মালিহা বলেন, ‘১৯ তারিখ সোমবার আমার মেয়েকে সকাল ৮টায় মাদরাসায় পাঠাই।
ওদের ক্লাস সাড়ে ১০টা পর্যন্ত হয়। সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত স্পেশাল আরবি ক্লাস হয় যেটা ওই স্যার নেন। ছুটি হওয়ার পর মেয়ে যখন বাসায় আসে, আমি খেয়াল করি তার মনটা খারাপ। একটু কান্না কান্না ভাব আর একটু ভয় নিয়ে আছে।
‘আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে মা তুমি এরকম ভয় পেয়ে আছো কেন? কি হয়েছে আমাকে খুলে বলো। আমাকে বলতে চাচ্ছিলো না। শুধু ভয় বলছিল আম্মু আমি বললে স্যার আমাকে মারবে। স্যার আমাকে মেরে ফেলবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি তাকে আবার বলি, আমাকে একটু খুলে বলো।
পরে বলছে স্যার আমাকে আদর করছে। কি আদর করছে মানে কেমন আদর সে আমাকে বলছে ব্যাড টাচ।’
‘আম্মু আমাকে স্যার ব্যাড টাচ করেছে। ব্যাড টাচ মানে কোথায় কোথায় তোমাকে ব্যাড টাচ করেছে। তো সে আমাকে বলল যে আম্মু আমাকে এই যে গালে, কপালে, ঠোঁটে—মানে বিভিন্ন জায়গায় পুরোটাই ব্যাড টাচ।’
‘আমি বললাম এটা কোথায় হয়েছে? ওই মাদরাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা আছে রুমের ভেতরে। এটা তো করা সম্ভব ছিল না।’
‘আম্মু স্যার আমাকে বলছে সিঁড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা নাই।
আমর যখন ক্লাস শেষে সবাই বের হয়ে যাচ্ছিলাম ছুটির পর যখন তারা উপর থেকে নেমে আসে তখন স্যার স্যার ওর হাতটা টেনে ধরে সিঁড়ির মধ্যে এগুলো করে।’
‘স্যার তাকে নিজেই বলে দেখো তুমি যদি এই কথাটা বাসায় গিয়ে বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না কারণ সিঁড়িতে কোন সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো নাই। তোমার গার্ডিয়েনদেরকে জানালে আমি কিন্তু তোমাকে মেরে ফেলবো। তুমি এই কথা কাউকে বলতে পারবা না।’
ফোনে মালিহা বলেন, ‘মেয়ে থেকে এই ঘটনা জানার পর আমি মাদরাসারই একজন ম্যাডামকে জানাই এই বিষয়টা। উনার নাম হচ্ছে লুনা ম্যাডাম। ওনাকে জানানোর পর উনি আমাকে বলল দেখেন এটা তো প্রথমবার ছিল আমরা স্যারকে আরেকটা সুযোগ দিই। আমি মা হিসেবে ওনার এই কথায় সন্তুষ্ট হতে পারিনি। পরে আমি সাথে সাথে ভাইস প্রিন্সিপাল আলাউদ্দিন সাকিব ওনাকে ফোন দেই যে স্যার তখন কিন্তু তিনি মাদ্রাসায় ছিলেন না। তিনি নাকি ছুটিতে ছিলেন। তো ওনাকে আমি জানাই যে আমার মেয়ের সাথে এরকম এরকম হয়েছে। স্যার এরকম ব্যাড টাচ করেছে। তো উনি বলল যে আমরা তাৎক্ষণিক পরের দিনই ২০ তারিখেই আমরা সিঁড়িতেও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে দেব এবং সর্বক্ষণই একজন মহিলা শিক্ষক নিয়োজিত থাকবে। যখন একজন পুরুষ শিক্ষক ক্লাস নেবে তখন পাশাপাশি একজন মহিলা শিক্ষকও থাকবে। ওনার কথায় আমি আশ্বস্ত হয়ে ২০ তারিখে আমার মেয়েকে মাদরাসায় পাঠাই।’
‘পাঠানোর পরে সেইদিনও ওই স্যার ক্লাস করে এবং আমার মেয়েকে বলে যে তোমাকে আমার পছন্দ। তোমাদের বাসার নাম্বার কত? মানে আমার মেয়ের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে বাসার নম্বর জেনে নিয়েছে।’
‘মেয়ে বাসায় আসার পর পর-পরই উনি আমাদের বাসায় চলে এসেছে। আর তখন আমি আমার সন্তানদেরকে নিয়ে বাসায় একা ছিলাম। কোন পুরুষ মানুষ বাসায় নাই। উনি আমার বাসার সামনে এসে বারবার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। বলছে—আপনার বাসার দরজা খুলেন আপনার সাথে আমার কথা আছে।’
‘আমি শুধু বলেছি আপনার সাথে আমি কোন কথা বলতে পারব না বাচ্চার বাবা কথা বলবে এই বিষয়ে আপনার সাথে। তারপরেই আমি বাচ্চার বাবাকে জানাই ঘটনাটা। উনারা সবাই আমার বাচ্চার সাথে অন্যায় করেছে, এখন উনারা অস্বীকার করেছে। আমি আমার ছোট বাচ্চা মেয়েটার প্রতি হওয়া অন্যায়ের জন্য বিচার চাই। সুষ্ঠু বিচার চাই।’
গত ২১ ক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়ায় অবস্থিত ক্বরিউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মোসলেম আহম্মদের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে।
শিশুটির পরিবারের সদস্যরা মাদরাসায় গিয়ে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ওই সময় শিক্ষক অপরাধ স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শাহজালাল রুমি তাকে চড় মারেন। পরে উপস্থিত জনতা ওই শিক্ষককে মারধর করেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই শিক্ষককে উদ্ধার করে এবং গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙচুর ও টাকা লুটের অভিযোগে মাদরাসা কর্তৃপক্ষও পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেছে।







