হবিগঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু ও কিশোর। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় হাসপাতালের মেঝেতেই চলছে অনেক রোগীর চিকিৎসা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে হবিগঞ্জ জেলার ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে মারা গেছেন তিনজন। অন্য ১৮ জন সিলেট, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মৃতদের অধিকাংশই শিশু।
জেলা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জেলায় হাম সংক্রমণ বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও কিশোরের সংখ্যাই বেশি। এ পর্যন্ত জেলায় আড়াই হাজার শিশু ও কিশোরসহ মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা আধুনিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আমিনুল হক সরকার।
বর্তমানে হাম আক্রান্ত শতাধিক রোগী হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের নির্ধারিত ২০ শয্যার পাশাপাশি মেঝেতেও রোগীদের রাখতে হচ্ছে। হাসপাতালের ষষ্ঠ তলায় হাম রোগীদের জন্য ২০ শয্যার একটি আইসোলেশন সেন্টার রয়েছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হওয়ায় সেখানে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
তবে রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও শয্যা দুটিই অপ্রতুল। ফলে একজন চিকিৎসককে একসঙ্গে অনেক রোগী দেখতে হচ্ছে। অনেক সময় চিকিৎসকের পরিবর্তে নার্সদের ওপরই রোগীর দেখভালের বড় দায়িত্ব পড়ছে।
হবিগঞ্জ শহরের উমেদনগর এলাকার বাসিন্দা সবুজ মিয়া বলেন, তার এক আত্মীয় হামে আক্রান্ত হওয়ার পর জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকায় তাকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় চিকিৎসকরাও চাপের মধ্যে রয়েছেন। ফলে রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি হাম রোগীদের জন্য অতিরিক্ত শয্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিশ্চিত করার দাবি জানান।
জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আমিনুল হক সরকার বলেন, প্রতিদিন হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালে হাম রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সদর হাসপাতালে কোনো পেডিয়াট্রিক কনসালটেন্ট নাই। একটি সিনিয়র কনসালটেন্ট ও একটি জুনিয়র কনসালটেন্ট পোস্ট থাকলেও এসব পোস্টে কোনো চিকিৎসক নাই৷ এরপরও হাসপাতালের দুই চিকিৎসক ও নার্সরা যথাসাধ্য চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। তাই রোগী ও স্বজনদের সচেতন হতে হবে। হাম মোকাবিলায় সময়মতো এমএমআর টিকা গ্রহণ করতে হবে। কেউ আক্রান্ত হলে তাকে দ্রুত অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জ জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মুখলিউছুর রহমান উজ্জল বলেন, হামে আক্রান্ত হয়ে সিলেট, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হবিগঞ্জ জেলার ১৮ জন মারা গেছেন। এছাড়া জেলা সদর হাসপাতালে মারা গেছেন তিনজন। সব মিলিয়ে জেলায় হাম আক্রান্ত হয়ে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের অধিকাংশই শিশু।
তিনি আরও বলেন, হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে দ্রুত অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া ও শরীরে র্যাশসহ হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখার পাশাপাশি টিকাদানের বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।
এদিকে হবিগঞ্জ জেলায় হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্সের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন রোগীর স্বজনরা। একই সঙ্গে হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও আইসোলেশনে রাখা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রোগীর চাপ অব্যাহত থাকলে হাসপাতালের সীমিত শয্যা ও জনবল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।







