যশোরের কেশবপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র দুই বছর আগে খনন করা একই খালে আবারও প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫ থেকে ৩০ টাকা মূল্যের ছোট চারা গাছের প্রতিটির দাম ভাউচারে ৫০১ টাকা করে দেখানো হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ধর্মপুর ব্রিজ থেকে ৩ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার বাঁশবাড়িয়া খাল খননের জন্য ৫১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮১ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২৩ মে কাজ শুরু হয়ে ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ দেখানো হয়।
প্রকল্পের সভাপতি করা হয় সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. কামরুল ইসলামকে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মূলত ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুলই প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি এক্সকাভেটর দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ দিন খননকাজ করা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা করে কাজ হওয়ায় মোট কাজের সময় ১০০ ঘণ্টার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ প্রকল্পের কাগজপত্রে ৭৯৫ ঘণ্টার বেশি এক্সকাভেটর চালানোর হিসাব দেখিয়ে ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬৭ টাকা বিল করা হয়েছে।
ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুলের দাবি, উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তাকে দুই দফায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা দিয়েছেন। বাকি টাকা সংশ্লিষ্টরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রকল্পের ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত ৪৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ টাকা ব্যয় হিসেবে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রকল্পে খালের দুই পাড়ে ৩০০টি বনজ ও ফলজ গাছ লাগানোর জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ৪২৩ টাকা বরাদ্দ ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের একাংশে সামান্য কিছু গাছ লাগানো হলেও মেহেরপুর এলাকায় কোনো গাছ লাগানো হয়নি। যেসব ছোট চারা রোপণ করা হয়েছে, সেগুলোর বাজারমূল্য ৫ থেকে ৩০ টাকা হলেও ভাউচারে প্রতিটির দাম ৫০১ টাকা দেখানো হয়েছে।
এদিকে ১১৪ জন শ্রমিককে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে মজুরি দেওয়ার কথা থাকলেও ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শ্রমিক। তাদের দাবি, বাস্তবে ৮ থেকে ১০ দিন ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। অথচ কাগজপত্রে পুরো মেয়াদে শ্রমিক কাজ করেছেন দেখিয়ে ভাউচার করা হয়েছে।
সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মোস্তাফিজুর রহমান মুক্ত বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে বিএডিসির অর্থায়নে বাঁশবাড়িয়া খালটি আগে থেকেই খনন করা হয়েছিল। তার দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো স্থানে একবার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে সেখানে নতুন প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ নেই।
স্থানীয় কৃষিবিদ ওয়াজেদ খান ডবলু বলেন, খালের পাড়ে সাধারণত পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বনায়নের জন্য উন্নত জাতের মাঝারি আকারের কাঠ বা ফলজ চারা রোপণ করা হয়। স্থানীয় নার্সারিতে এসব চারার সর্বোচ্চ দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। ফলে প্রতিটি চারার দাম ৫০১ টাকা দেখানো অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রকল্পের ট্যাগ কর্মকর্তা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইয়াছির আরাফাত বলেন, প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তা তার জানা নেই। তিনি শুধু মাঝে মাঝে গিয়ে শ্রমিকদের উপস্থিতি দেখেছেন। খাল পরিমাপের কোনো তালিকা তাকে দেওয়া হয়নি এবং গাছ লাগানোর বিষয়েও তাকে জানানো হয়নি। তবে তার মতে, দেখা গাছগুলোর দাম ৫০১ টাকা হওয়ার কথা নয়।
প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, তাকে সভাপতি করা হলেও দলীয় লোকজন কাজ করেছেন। গাছ তারা কিনেছেন, তবে গাছগুলো ছোট হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। একই সঙ্গে দুই বছর আগে ওই খাল খনন করা হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই বলে জানান।
অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী দেবদাস বিশ্বাস। তার দাবি, প্রকল্প অনুযায়ী কাজ শেষ হয়েছে এবং গাছের ক্ষেত্রেও কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে আগের অর্থবছরে খালটি খনন করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের সরেজমিন পরিদর্শন শেষে বলেন, প্রাথমিকভাবে খাল খনন ও গাছ রোপণে কিছুটা দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তার হিসাবে, গাছ ও খাঁচা মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা খরচ হতে পারে। তদন্ত শেষ হলে অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা যাবে।







