কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ১৩ দিনের ঈদযাত্রায় সারা দেশে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত এবং ৮৩৭ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার, যা ঈদযাত্রার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। নয়টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এতে ওই সময়ের দুর্ঘটনা, হতাহত এবং যাতায়াত পরিস্থিতির বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ১৩ দিনের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার সারা দেশে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত এবং ৮৩৭ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার, যা ঈদযাত্রার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার ৪৮ দশমিক ২৮ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এ সময়ে ১৪১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১২৪ জন নিহত হন, যা মোট নিহতের ৪৪ দশমিক ১২ শতাংশ।
সংগঠনটি আরও জানায়, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে এক কোটির বেশি মানুষ গ্রামের বাড়িতে গেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রায় চার কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। তবে ঘরমুখী ও ফিরতি ঈদযাত্রায় ট্রেন ছাড়া সড়ক ও নৌপথে যাত্রীদের ভোগান্তি তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদযাত্রার এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। এছাড়া ৩৩ জন চালক ও পরিবহন সহকারী প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট নিহতের ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি ১৩টি নৌপথ দুর্ঘটনায় আটজন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় কোরবানির ২৪টি গরুও মারা গেছে। অন্যদিকে, ২২টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৯ জন আহত হয়েছেন।
যানবাহনভিত্তিক হতাহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেলচালক ও আরোহীই সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এ শ্রেণিতে নিহতের সংখ্যা ১২৪ জন, যা মোট নিহতের ৪৪ দশমিক ১২ শতাংশ। এছাড়া বাসযাত্রী ২১ জন, ট্রাক, কভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও ট্রলির ৩২ জন, প্রাইভেটকার ও অ্যাম্বুলেন্সের ১১ জন, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা ও অটোভ্যান) যাত্রী ৪৮ জন এবং নসিমন, ভটভটি ও মাহিন্দ্রার মতো স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের ৮ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৭৩টি (২৫ শতাংশ) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১২৭টি (৪৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৩৮টি (১৩ শতাংশ) পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া, ৪২টি (১৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১২টি (৪ দশমিক ১০ শতাংশ) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
এসব দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৫০৭টি। এর মধ্যে ৭৯টি বাস, ৬১টি ট্রাক, ১১টি কভার্ড ভ্যান, ২৪টি পিকআপ, ৫টি ট্রলি, দুটি লরি, সাতটি ডাম্প ট্রাক, ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি, একটি গ্যাসবাহী লরি, ৫টি মাইক্রোবাস, ১১টি প্রাইভেটকার, ৪টি অ্যাম্বুলেন্স এবং দুটি এসইউভি (জিপ) রয়েছে।
এছাড়া ১৫৭টি মোটরসাইকেল, ৯৩টি থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা ও অটোভ্যান), ১৮টি স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন, ভটভটি ও মাহিন্দ্রা) এবং ১২টি প্যাডেল রিকশা ও সাইকেল এবং ১৪টি অজ্ঞাত যানবাহনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ৯৫টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১০১ জন। সবচেয়ে কম ৯টি দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত হয়েছেন সিলেট বিভাগে। একক জেলা হিসেবে ফরিদপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি ১৯টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে এক কোটির বেশি মানুষ গ্রামের বাড়িতে গেছেন এবং সারা দেশে প্রায় চার কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। ঘরমুখী ও ফিরতি ঈদযাত্রায় ট্রেন ছাড়া সড়ক ও নৌপথে যাত্রীদের ভোগান্তি তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
তবে উত্তরবঙ্গমুখী সড়কে যানজটের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। তাদের মূল্যায়নে বলা হয়, অব্যবস্থাপনার কারণে সড়ক, রেল ও নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলেও তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। এছাড়া টিকিট কাটার পরও কিছু যাত্রী নির্ধারিত ট্রেনে উঠতে পারেননি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঢাকার সদরঘাটে যাত্রীদের ব্যাপক চাপ থাকলেও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে ঈদযাত্রার সময় টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ জন প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু হয়। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য।
এছাড়া এক্সপ্রেসওয়ে ও অন্যান্য মহাসড়কে বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের পেছনে অন্য যানবাহনের ধাক্কায় ১৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ১২ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১২ জন নিহত হয়েছিলেন, যা দৈনিক গড়ে ২৬ জন। অন্যদিকে, চলতি বছরের ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ২১ দশমিক ৬১ জন। সে হিসেবে গত বছরের তুলনায় সড়কপথে প্রাণহানি ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমেছে।







