জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকড: ডিবি চায় ডিভাইস, জামায়াতের উদ্বেগ নিরাপত্তায়

Post Image


বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগের আট মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ঘটনার রহস্যের কিনারা হয়নি। মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ সংশ্লিষ্ট ডিভাইস চেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ জন্য আদালতের অনুমতি নিয়ে বাদীপক্ষকে অন্তত তিনবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তবে ডিভাইসগুলো এখনো তদন্ত সংস্থার হাতে পৌঁছায়নি।

অন্যদিকে, ডিভাইস দিতে আপত্তি নেই জানিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছে বাদীপক্ষ। নিজেদের উপস্থিতিতে ডিভাইস পরীক্ষা করার বিষয়ে ডিবির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মামলার বাদী মো. সিরাজুল ইসলাম।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়া অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশের সময়, পদ্ধতি ও সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া কঠিন। এদিকে মামলার অন্যতম আসামি বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে দ্রুত তদন্ত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। তবে বাদীপক্ষের ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং এক্স কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-দক্ষিণ ইউনিট। তদন্তের স্বার্থে জামায়াত আমিরের ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ সংশ্লিষ্ট ডিভাইস ও অন্যান্য আলামত জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে বাদী সিরাজুল ইসলামের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হাফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে বাদীপক্ষের কাছে অন্তত তিনবার চিঠি দিয়ে ডিভাইস ও তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে তাঁরা এখনো ডিভাইস দেননি।

তবে সর্বশেষ কবে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং আদালত কবে ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তারিখ জানাতে পারেননি তিনি।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ এপ্রিল ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ তদন্তের প্রয়োজনে ডিভাইস পরীক্ষার আইনি অনুমতি থাকলেও সেগুলো তদন্ত সংস্থার হাতে না পৌঁছানোয় প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে না।

মামলার বাদী মো. সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ডিবির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা দুইবার তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। ডিভাইস দিতে অস্বীকৃতি জানানো হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়; বরং ডিভাইসের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।

সিরাজুল ইসলামের ভাষ্য, ডিভাইস পরীক্ষা করার সময় তাঁদের উপস্থিত থাকার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তাঁর মতে, ডিভাইস জমা দেওয়ার পর সেগুলোর তথ্য ও নিরাপত্তা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

তিনি আরও জানান, মামলা করার সময় তাঁদের গবেষণায় পাওয়া কিছু কাগজপত্র তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছিল। সরকারের সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত কোনো জায়গা থেকে হ্যাকিং হয়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনার পক্ষে কিছু কাগজপত্রও তাঁরা দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে হ্যাকিংয়ের উৎস নিশ্চিত হয়েছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাইবার অপরাধের তদন্তে সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুঠোফোন, কম্পিউটার বা ল্যাপটপে থাকা লগইন-সংক্রান্ত তথ্য, সেশন রেকর্ড, সন্দেহজনক সফটওয়্যার কিংবা ফিশিংয়ের সম্ভাব্য আলামত বিশ্লেষণ করে ঘটনার ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে কখন, কোথা থেকে এবং কীভাবে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটেছে, তা নির্ধারণে এসব তথ্য সহায়ক হতে পারে। তবে ডিভাইস পরীক্ষা করলেই সব ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হয় না; প্ল্যাটফর্মের তথ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামতের সঙ্গেও সেগুলো মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাদীপক্ষের ডিভাইস না পাওয়ায় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

মামলার অন্যতম আসামি মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমের ব্যবহৃত মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ জব্দ করে তল্লাশি চালিয়েছে ডিবি। ছরওয়ারে আলমের দাবি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত কিছু ডিভাইসও জব্দ করা হয়েছিল। প্রায় এক মাস পর সেগুলো ফেরত দেওয়া হয়।

জব্দ করা ডিভাইস থেকে কোনো আলামত পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এসব ডিভাইসের পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত জানানোর সুযোগ নেই।

মামলার শুরুর দিকে এক্স কর্তৃপক্ষের কাছেও বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে সেখান থেকেও কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফরেনসিক প্রতিবেদন ও এক্স কর্তৃপক্ষের তথ্য হাতে পাওয়ার পরই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পাওয়া ছরওয়ারে আলম শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তাঁর বক্তব্য, শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তাঁর ব্যবহৃত ডিভাইস পরীক্ষা করেও এখন পর্যন্ত তাঁর সংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্যপ্রমাণ তাঁকে জানানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি।

ছরওয়ারে আলম প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াত আমিরের পক্ষের ডিভাইস পরীক্ষা করা হলে তদন্তের অগ্রগতি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘ওদের (জামায়াত) কাছে বারবার পাঠাইছে, মোবাইল চাইছে, চেক করার জন্য চাইছে। ওরা দিচ্ছে না। ওরা যদি ওদের ডিভাইস দিত, তাহলে এত দিনে এটার সমাধান হয়ে যেত।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাঁরা তো বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁরা তদন্তে সহযোগিতা না করলে আমার তো এভাবেই ঝুলে থাকতে হবে। আমি সুবিচার চাই। সঠিক তদন্ত হলে আমি সুবিচার পাব।’

তবে বাদীপক্ষ ডিভাইস দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে—এমন বক্তব্যের বিপরীতে সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, তাঁরা তদন্তে সহযোগিতা করতে চান; ডিভাইসের নিরাপত্তা এবং নিজেদের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন।

মামলায় জড়ানোর পর সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় চাকরিতে ফিরতে পারেননি বলে জানিয়েছেন ছরওয়ারে আলম। তাঁর ভাষ্য, চাকরির মেয়াদ শেষ হতে আর কয়েক মাস বাকি। তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে পেনশনসহ চাকরিজীবনের আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

ছরওয়ারে আলম বলেন, ‘সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়ে আমি চাকরিতে ফিরতে পারিনি। আমাকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।’

তবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা কিংবা ঘটনার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফরেনসিক প্রতিবেদন ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পরই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। এর আগে বাদীপক্ষের ডিভাইস পরীক্ষা, এক্স কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং জব্দ করা অন্যান্য ডিভাইসের ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া তদন্তের অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একদিকে ডিভাইসের নিরাপত্তা নিয়ে বাদীপক্ষের উদ্বেগ, অন্যদিকে তদন্তে প্রয়োজনীয় আলামত না পাওয়ার কথা বলছে ডিবি। একই সঙ্গে মামলার আসামি দ্রুত তদন্ত শেষ করে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের সুযোগ চেয়েছেন।

এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করছে বাকি আলামত ও তথ্য সংগ্রহের অগ্রগতির ওপর।

এই বিভাগের আরও খবর

রাজনীতি

সর্বশেষ খবর

ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিবিরের ৬ষ্ঠ ডিপ্লোমা সামিট অনুষ্ঠিত

জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকড: ডিবি চায় ডিভাইস, জামায়াতের উদ্বেগ নিরাপত্তায়

সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে আবার মাঠে এসেছি : নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

সরকারকে সময় না দিয়ে বিরোধিতা করছে বিরোধী দল: মনির

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে : নাহিদ ইসলাম

‘দেশের নেতৃত্বে আসছে ইসলামপন্থীরা, এখন যোগ্যতা অর্জনের বিকল্প নেই’

‘চরমোনাই কওমিভুক্ত ছিল না, নওকওমি হয়েছে’

চরমোনাই ছেড়ে জামায়াতে যোগ দিল সাতক্ষীরার সাবেক চেয়ারম্যান প্রার্থী ফারুক হোসেন

সর্বাধিক পঠিত

সরাইলে নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগের ঝটিকা মিছিল, প্রতিবাদে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল

দিনাজপুরে এনসিপি নেতা বহিষ্কার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে ছাত্রশিবিরের স্বাগত র‍্যালি ও সমাবেশ

ছাত্রদল রাজপথে না থাকলে ছাত্রলীগ জামায়াত-শিবিরকে পিটিয়ে আবারও গুপ্ত বানিয়ে দিবে: রাশেদ খাঁন

দেশজুড়ে যাতায়াত ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা নিয়ে জামায়াতের উদ্বেগ

মাদক কারবারিকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা এমপি হানজালার

দেশের সীমান্তের মানুষগুলোর ফুড সেফটি নেই : নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

রাজনীতি নিয়ে নিজের অবস্থানে অনড় সাকিব

‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে বিএনপি সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করবে আদালত’

জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন ৫ আগস্টের আগে