দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৩ দফা ইশতেহারে গত বছর এই দিনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৬ পদের ২৪টিতেই পদে জয়লাভ করে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে নির্বাচনে চাকসুর কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিলো অনেক বেশি। তবে এক বছরে পুরোপুরি ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে পারেনি চাকসু সদস্যরা।
গত বছরের ১৫ অক্টোবর চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ অক্টোবর শপথ নেন চাকসুর নির্বাচিত নেতারা। বর্তমান কমিটির মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ২৩ অক্টেবর (বুধবার)।
এক বছরে ছাত্রশিবির-সমর্থিত সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোটের ৩৩ দফায় আবাসন সংকট নিরসন, যাতায়াত সমস্যার সমাধান, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসাসেবার উন্নতি ও নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠন ছিলো মৌলিক ইশতেহারে। এর মধ্যে আবাসন সংকটে স্বল্প কিছু উদ্যোগ, পরিবহনে বগি সংষ্কার ও নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ, মেডিকেল সেন্টারে অস্ত্রোপচারকক্ষ, আইনি সহায়তার জন্য ফ্রি লিগ্যাল এইড ও স্কিল ডেভলপমেন্ট ক্যাম্পসহ ইশতেহার অনুযায়ী বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে চাকসু।
চাকসুর নির্বাচনী ইশতেহারের ৩৩টি দফা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর মধ্যে ১৪টি দফা সম্পূর্ণ বা উল্লেখযোগ্যভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। অন্যদিকে ১৯টি দফা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো সংকটগুলোর একটি আবাসন। এখনো ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পান না। এ সমস্যা সমাধানে হলগুলোর বর্ধিত অংশ সংস্কার করে ১৯৭ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হয়েছে। ছাত্রশিবির প্যানেলের ইশতেহারে বলা হয়েছিলো, বিদ্যমান হল সংস্কার ও সম্প্রসারণ, নতুন ভবন নির্মাণ এবং অন্তত ১০ শতাংশ আসন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দীর্ঘ মেয়াদে নির্মাণ করা হবে বেশি শিক্ষার্থী ধারণক্ষমতার বহুতল হল। কিন্তু এক বছরেও সে প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি।
পরিবহনেও খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। একটি শাটলের সব বগি সংস্কার, আরেকটির বগি পরিবর্তন এবং যাত্রাকে নিরাপদ রাখতে নিরাপত্তা কর্মী যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও চালু করা হয়েছে প্রতিশ্রুত শাটল ট্র্যাকার অ্যাপ। তবে ইশতেহারে শাটল ট্রেনের সংখ্যা ও বগি বাড়ানো, প্ল্যাটফর্ম আধুনিকায়ন, দ্বিতীয় রেললাইন নির্মাণের কথা থাকলেও কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। ক্যাম্পাসে ই-কারের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলেও শহরের বিভিন্ন প্রান্ত ও আশপাশের উপজেলা থেকে বাস সার্ভিস চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
চিকিৎসাখাতেও রয়েছে আংশিক পূর্ণতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে অস্ত্রোপচারকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি হলে মেডিসিন কর্ণার স্থাপন এবং বেসরকারি মেডিকেলে চবি শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবায় শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারকে ৩০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর করার ইশতেহার বাস্তবায়ন করা হয়নি। জরুরি হেল্পলাইন চালু, মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক বৃদ্ধির ইশতেহারও বাস্তবায়ন হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে দুটি নতুন অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করা হয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, অনুষদভিত্তিক ও লাইব্রেরিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চাইল্ড কেয়ার ও দুগ্ধপান কর্নার-সংবলিত কমনরুমের প্রতিশ্রুতিও বাস্তব রূপ পায়নি। তবে নারীদের হলে সেলাই মেশিন প্রদান ও প্রশিক্ষণের আয়োজন, চাকরির প্রস্তুতিমূলক বই প্রদান এবং আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সাইবার বুলিং সেল গঠন করা হয়েছে।
এছাড়াও শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তার জন্য ফ্রি লিগ্যাল এইড ক্যাম্প ও ক্যাম্পাস থেকে কর্পোরেট চাকরির জন্য 'জব ফেয়ার' আয়োজন করা হয়েছে। গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নে মাসব্যাপী রিসার্চ ওয়ার্কশপ আয়োজন, মাস্টার্স (থিসিস), এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের প্রণোদনার ব্যবস্থা এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, জার্মান, জাপানিজ, চাইনিজ ও ইংরেজি ভাষার স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও প্রথম বর্ষ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কতৃক অফিশিয়াল ইমেইল প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া লাইব্রেরিতে জেনারেটর স্থাপন, বই নিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। সুলভ মূল্যের খাবার নিশ্চিত করতে ফুড সেল গঠন করা হয়েছে।
আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে যেসব ইশতেহার
ইশতেহারে প্রশাসনিক অটোমেশন, অনলাইন সেবা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি ছিল। অনলাইন ব্যাংকিং চালু হলেও ফল প্রকাশ, রেজিস্ট্রেশন, রেজিস্ট্রার ভবনের জটিলতা দূরীকরণসহ পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সেশনজট নিরসনে একাডেমিক ক্যালেন্ডার কার্যকর করা, পরীক্ষা-রুটিন-ফল প্রকাশ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
যেসব ইশতেহার বাস্তবায়ন করা হয়নি
বাস্তবায়িত হয়নি এমন কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে মেন্টাল হেলথ কাউন্সিল গঠন, শ্রেণিকক্ষ আধুনিকায়ন ও বিভাগীয় লাইব্রেরি আধুনিকায়নের উদ্যোগ। নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনে মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন প্রোডাক্ট সহজলভ্য করা, ফ্যাকাল্টির মসজিদে নারীদের আলাদা স্থান, লেডিস ঝুপড়িতে সুপারশপ ও ফার্মেসি স্থাপনের প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি।
এ ছাড়া অ্যালামনাইদের সঙ্গে সমন্বয়, হলভিত্তিক জিম, মাঠ সংস্কার, কটেজ-মেস তদারকি ইত্যাদি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ইশতেহারে শারীরিক প্রতিবন্ধী, আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি চালু করার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
কেন্দ্রীয় মিলনায়তন নির্মাণ, অন-ক্যাম্পাস চাকরি, মেন্টাল হেলথ কাউন্সিল এবং কেন্দ্রীয় জিমে শরীরচর্চার পর্যাপ্ত সুবিধাও অপূর্ণ অঙ্গীকারের তালিকায়। টিএসসির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা থাকলেও এখনো দেখা মেলেনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কোনো কার্যক্রম।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মিল খুজতে চবি শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছে ঢাকা ডায়েরি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী সানজিদা নাজনীন নিহা বলেন,“কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির মধ্যে অনেকগুলো পরিবর্তন তারা আনার চেষ্টা করেছে। বসার জায়গা ও বইয়ের স্বল্পতা সবকিছু তারা সমাধানের চেষ্টা করেছে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় তাদের কাজের ঘাটতি ছিল। যেমন যাতায়াতের মাধ্যম শাটল ট্রেনের সংস্কারে ঘাটতি ছিল। ই কার দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনও রাতের ৯ টা অথবা ১০ টা বাজে আমরা যখন যাই, তখন প্রায় সময়েই ই-কার পাওয়া যায় না।”
নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২৪-২৫ বিভাগের শিক্ষার্থী তাজকিয়াতুন নুর অপি বলেন,“ক্যাফেটেরিয়াতে মেয়েদের জন্য পর্দা লাগানো স্থানে গিয়ে দেখি ছেলেরা বসে আছে। এটা যদিও চাকসুর দোষ না, তবে এভাবে কার্যকর কিছুই হয় নাই। হলগুলোর মধ্যে খুটিনাটি কিছু কাজ করেছে চাকসু। কিছু কিছু হলের ক্যান্টিনে একটু সুবিধা করেছে। আর মেয়েদের হলে সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আবার মেয়েদের হলে বিভিন্ন রকমের বই প্রদান করা হয়েছে। এটা আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু আবাসনের সমস্যায় নতুন করে কেউ কোনো সুবিধা পায় নাই। আবাসনের সমস্যা সেই আগের মতোই আছে।”
এক বছরে চাকসুর কার্যক্রমের বিষয়ে চাকসু জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন,“চাকসুতে আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার চেষ্টা। ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক দলের মারামারির কোনো ঘটনা ঘটেনি। ক্যাম্পাসে চাকসুর নেতৃবৃন্দ কাউকে হয়রানি করেছে এমন কোনো ঘটনাও ঘটেনি। শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করে। হলের সিট দখল, রাজনৈতিক হানাহানি এ কাজগুলো কিছুই হয়নি। অর্থাৎ একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস আমরা গড়তে পেরেছি। যেখানে চাকসু নেতৃবৃন্দ এ ক্যাম্পাসের প্রতিনিধি ছিলো, কখনো নেতা হয়নি। প্রশাসনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা যেন আগামী ৩ মাসের মধ্যেই পরবর্তী নির্বাচন দেয়।”
ইশতেহার বাস্তবায়নে চাকসু নেতারা ব্যর্থ বলছে ছাত্রদল
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও গত চাকসু নির্বাচনে পরাজিত ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন,“চাকসুতে যারা নির্বাচিত হয়েছে তারা শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণা করেছে। চাকসুর শুরুর দিকে তারা শতভাগ আবাসনের জন্য আওয়াজ তুলেছিল। আবাসন দিতে না পারলে আবাসন ভাতা দেওয়ার কথা বলেছিল। শাটলকে ভিন্নরূপে নিয়ে যাওয়া এবং নতুন শাটল যুক্ত করা, শহর ও উপজেলার সাথে বাস দেওয়ার কথা বলেছিল। মেডিকেল সেন্টারকে 'নাপা সেন্টার' বলে উপহাস করে তারা বলেছিল এটাকে একটা পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ব্যবস্থায় নিয়ে যাবে। আমাদের মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে তারা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছে, তা কি তারা আদৌও পূরণ করতে পেরেছে। এর বাইরে টুকটাক যেসব কাজ করেছে তা সচরাচর যেকোনো প্রশাসন করে থাকে। কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলো পূরণে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।”
ছাত্রদলের প্যানেল থেকে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে এজিএস পদে জয়ী হয়েছিলেন আইয়ুবুর রহমান তৌফিক। তিনি বলেন,“চাকসুর শিবির অংশ বিভিন্ন সভা-সেমিনার করেছে যেখানে তাদের নিজস্ব আদর্শের মানুষরাই উপস্থিত ছিল। শিক্ষার্থীদের কল্যাণ বা তাদের চিন্তা টা ধারণ করার চেয়ে নিজস্ব আদর্শ প্রচার এবং তাদের আদর্শের মানুষকে প্রমোট করার কাজে চাকসু প্ল্যাটফর্মটাকে বেশি ব্যবহার করেছে। ব্যর্থতার দায় আমি তখনই নিতাম, যখন তারা আমার সাথে সম্পৃক্ত থাকতো। সম্পাদকরা এবং ভিপি-জিএস কাজ করার আগে আমার কাছ থেকে কোনো পরামর্শ নিতো না। আমাকে ছাড়াই বিভিন্ন প্রোগ্রাম আয়োজন করা এবং অনুষ্ঠান চালু করে ফেলত। এ জায়গায় তাদের দায় আমি নিবো না এবং আমি স্বতন্ত্রভাবেই আমার কথাগুলা বলার চেষ্টা করেছি।”
চবি প্রশাসন যা বলছে
চাকসু সভাপতি উপাচার্য অধ্যাপক ড মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে যথাসময়ে চাকসু নির্বাচন আয়োজন করার চেষ্টা করবো। আমার মতে আমরা ভালোভাবেই কাজ করেছি। আমার মেয়াদে এসে ৬ মাসের মধ্যে যতটুকু সম্ভব আমরা কাজ করেছি। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা পরস্পর পরস্পরের সাথে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে কাজ করেছি। সরকার থেকে হল অনুমোদন না হলে হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে কী লাভ হবে। ডিপিপি দিয়ে আগে বাজেট অনুমোদন হতে হবে। নাকি আমি আগামীকাল সব হলগুলোর বাজেট অনুমোদন দিয়ে দিবো, যেখানে টাকার কোনো খোঁজ নাই।







