দেশ যখন তার নাগরিকদের কল্যাণ তাদের ভাবনা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখে তখন সিরাজউদ্দিনরা যুদ্ধকষ্ট, রোগ শোকের যন্ত্রণার অমানিশা শেষে স্বদেশের মাটি ছুঁতে পারে, প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে, ভালোবাসার চোখের জল ফেলতে পারে। সাগরের গভীর জলের ওপর ভেসে চলা বাংলাদেশের দুঃসাহসী নাবিকরা যখন ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে আটকা পড়ে কম্পাসে দিক খুঁজে পেতে দিশেহারা হয়ে যায়, চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ যখন ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে অন্ধকার দেখতে থাকে তখন তাদের মুক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সফল হয় যে দেশটি সেটি বাংলাদেশ।
হ্যাঁ, আমি বলছিলাম ইরানের বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া আরো ১৪ জন বাংলাদেশি কিভাবে দেশটির সরকারের উদ্যোগে, তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের অক্লান্ত চেষ্টা, ইরান ও আর্মেনিয়া সরকার এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বা আইওএম-এর সহযোগিতায় ঢাকায় প্রত্যাবাসন করল সে কথা।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর যখন ইসলামাবাদ বৈঠক ব্যর্থ হলো, বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার স্রোত ভাসছে এরপর কী হবে- ঠিক তখন তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস আর্মেনিয়া হয়ে আরো ১৪ জন বাংলাদেশিকে ইরান থেকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেছে।
এর আগে গত ১৯ মার্চ তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাস ঢাকা থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ১৮৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরত পাঠায়। তবে এবারে ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে আজারবাইজানে যাতায়াত ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আর্মেনিয়া হয়ে এই ১৪ জন নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দূতাবাস। প্রবাসে আসা প্রতিটি প্রাণের একটা গল্পগাঁথা থাকে। কোনো কোনো গল্প হয়ে ওঠে সকরুণ, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, ব্যথিত করে মানব হৃদয়।
এবারে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া ১৪ জনের মধ্যে সিরাজউদ্দিনের আখ্যানটিও সেরকম।
আজ বিকেল ৩টা তখনো বাজেনি, তেহরানের বাংলাদেশ দূতাবাসের থার্ড সেক্রেটারি ও এইচওসি বনান ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। গত কয়েকদিন ধরে দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স রাবেয়া আপা ও বনান ভাইসহ দূতাবাসের বিশেষ টিম এই ১৪ জনকে দেশে পাঠানোর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। সেই বহু দূরের বন্দর আব্বাস, তারপর তেহরান, বুশেহর, আর্মেনিয়া সীমান্ত- সেখানকার রাজধানী ইয়েরেভান, তারপর দুবাই, অবশেষে ১৪ জন বাংলাদেশি ঢাকা পৌঁছাল ১২ এপিল রাত ৯টা ৪০ মিনিটে।
রোগশোকে ভোগা শীর্ণকায় সিরাজউদ্দিন তার ফুটফুটে দুই কন্যা শিশু, তার স্ত্রী ও অন্য নয়জন। এরপর রাবেয়া সুলতানা আপা ও বনান ভাই দীর্ঘ ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তার সময়কে দূরে ঠেলে দিয়ে একরাশ ঘুম চোখে অনুপম এক প্রশান্তি নিয়ে তেহরান ফিরলেন। এই ক’দিনের গল্প শুনছিলাম বনান ভাইয়ের মুখে।
বলছিলাম, প্রতিটি প্রাণের গল্প থাকে। কোনো কোনো গল্প ছুঁয়ে যায় মন-প্রাণ।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে উষ্ণ মরুঅঞ্চল হরমুজগান প্রদেশের রাজধানী বন্দর আব্বাসের কেশমদ্বীপে প্রায় ৩৫ বছর ধরে থাকতেন মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন। ১৯৭০ সালের ৫ জুলাই জন্ম তাঁর। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি টগবগে তরুণ বয়সে ভাগ্য অন্বেষণে প্রবাসে পাড়ি জমান। নদী, সাগর পেরিয়ে ইরানের বন্দরের কেশম দ্বীপে শুরু করেন জীবনযাপন। দিন-রাত্রি, সপ্তাহ, মাস, বছর গুণতে গুণতে একে একে প্রায় ৩৫ বছর কেটে গেলেও ফেরা হয়নি স্বদেশের মাটিতে। জীবনযুদ্ধের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন কেশমদ্বীপের লোনা জলের ঠিকানায়। অবৈধ অভিবাসী হয়েও বছর কয়েক আগে বড় জটিল সমীকরণ পেরিয়ে বউকে নিজের কাছে আনতে পেরেছিলেন তিনি। এর মধ্যে দ্বীপেই জন্ম দেয় তাঁদের দুই ফুটফুটে রাজকন্যা। ওরা হেসে খেলে সাগরের লোনা জল ছুঁতে ছুঁতে একটু একটু করে বড় হতে থাকে।
কিন্তু সিরাজউদ্দিন অতিরিক্ত খাটুনির জীবনভার বইতে বইতে জটিল অসুখ বাঁধিয়ে ফেলেন। কিডনির সমস্যাসহ নানান জটিল ব্যাধি ভর করে তাঁর দেহে। এসব নিয়ে জীবন কাটতে থাকে। সুদর্শন উচ্ছ্বল সেই তরুণ মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন এখন কঙ্কালসার বৃদ্ধ। কেশমেই সাধ্যমতো চিকিৎসা চালাচ্ছিলেন অতি কষ্টে। তারপর শুরু হলো যুদ্ধ। কী করবেন সিরাজউদ্দিন? দিশেহারা হয়ে পড়লেন। দুটি কন্যা শিশু আর স্ত্রীর ভরণপোষণ, নিজে কিডনি জটিলতাসহ নানান রোগে আক্রান্ত। ডায়ালাইসিস করাতে হয়। কী করবেন তিনি? বাংলাদেশের সরকার তার নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের চিন্তায় দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অতিমাত্রায় অসুস্থ থাকার কারণে ঢাকায় ফেরা প্রথম দফার ১৮৬ জনের সঙ্গে সিরাজউদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এরপর তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাস সরকারের নির্দেশনায় নিজেদের সর্বোচ্চ শ্রম, চেষ্টা ও আন্তরিকতায় এ দফায় দুই ভাগে ১৪ জন নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি সরল কোনো বিষয় ছিল না। একেতো যুদ্ধ চলছিল এবং ইরানের একেক প্রান্তে থাকা মানুষগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে বাসে করে আর্মেনিয়া সীমান্ত হয়ে রাজধানী ইয়েরেভানে নেওয়া এবং তার আগে ইরান সরকারের অনুমতিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করা ছিল জটিল কাজ। এর মধ্যে দুজন ছিলেন জটিল কিডনি রোগী।
একজন চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন যুদ্ধের আগে। আর সিরাজউদ্দিনের অবস্থার কথা তো বললামই। বুশেহর প্রদেশের গেনা বন্দরে আটকে পড়া পাঁচজন নাবিকও ছিলেন। ছিলেন তিনজন নারী। পাঁচজন নাবিকের দলটি আর্মেনিয়ার ইয়েরেভান থেকে গত ৯ এপ্রিল রওনা হয়ে ১০ এপ্রিল নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছান। আর দ্বিতীয় দলে থাকা হতভাগ্য সিরাজউদ্দিনকে তাঁর স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ বাংলাদেশ দূতাবাস সেই কেশমদ্বীপ থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় তেহরানে এনে হোটেলে রাখে। সেখানে সিরাজউদ্দিনের ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে আর্মেনিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত নেওয়া হয় তাঁকে।
আলাদাভাবে বাসে করে নেওয়া হয় তাঁর পরিবার ও অন্যদেরকে। সীমান্ত পার হয়ে ওপার থেকে আবারো অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানী ইয়েরেভানে। পুরো প্রক্রিয়ায় সার্বক্ষণিক সঙ্গে ছিলেন তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স রাবেয়া সুলতানা আপা, এইচওসি বনান ভাই, দূতাবাস সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরা এবং আইওএম কর্মকর্তারা। ঢাকা থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনেই তারা প্রতি মুহূর্তে সামনে এগিয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবাসিত এই নাগরিকদের দলে সিরাজউদ্দিনসহ অপর একজন কিডনি রোগী নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকায় তাঁদের যাত্রাপথে ট্রানজিটকালে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেখানকার বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেল বিশেষ সেবা প্রদান করে।
ঢাকা বিমানবন্দরে তাঁদের অবতরণকালে অভ্যর্থনা জানাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম-এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন বলে জেনেছি। দীর্ঘ পথের যাত্রা শেষে ৩৫ বছর পর শীর্ণকায় সিরাজউদ্দিন হুইল চেয়ারে করে ঢাকায় নামলেন। তার কন্যা দুটি প্রথমবারের মতো দেশের মাটি ছুঁতে পারলো, দেখলো মাতৃভূমি বাংলাদেশকে। ঢাকা থেকে সরকারের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সিরাজউদ্দিনকে তাঁর পরিবারসহ পাহাড় কোলের মীরসরাইয়ে পৌঁছে দেওয়া হলো। বাকিরাও এক বুক শ্বাস নিয়ে নিজ নিজ ঘরে ফিরলেন। সিরাজউদ্দিন তাঁর কন্যা দুটি ও অন্যরা তেহরানের বাংলাদেশ দূতাবাস আর নিজের দেশের এ ভালোবাসাময় উদ্যোগের কথা হয়তো কোনোদিন বিস্মৃত হতে পারবে না।
এদিকে ইরানেও বাংলাদেশ দূতাবাস এই পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার জন্যে ইরান সরকার, আর্মেনিয়া সরকার এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ দূতাবাস এই সংকটের শুরু থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিক নির্দেশনা মেনে ইরানে আটকে পড়া এবং সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা, নিয়মিত জরুরি সহায়তা প্রদান এবং দেশ ফেরত পাঠানোর জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি এই সফল উদ্যোগ প্রমাণ করে যে সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ।







