পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, আইজিপি মূলত বেনজীর, বিপ্লব ও হারুনদের উত্তরসূরি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। আইজিপির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারের ইচ্ছামাফিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অপসংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার মনোবাসনা প্রকাশ পেয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) এক ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেছেন, সরকার চাইলে পুলিশ ক্রসফায়ার দিতে প্রস্তুত। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি যে সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছেন, সেই সংবিধানকেই অবজ্ঞা করেছেন। পুলিশের আইজিপি আলী হোসেন ফকির আজ বলেছেন, সরকার চাইলে তারা ক্রসফায়ার দিতে প্রস্তুত। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত সরকারের ইচ্ছামাফিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অপসংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার পৈশাচিক মনোবাসনা ব্যক্ত করেছেন। আলী হোসেন ফকিরের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি যে সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছেন, সেই সংবিধানকে অবজ্ঞা করেছেন। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা খোদ সরকারপ্রধানের ইচ্ছায় এই অধিকার কাউকে দেওয়া বা কেড়ে নেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই।
এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, যখন একজন পুলিশপ্রধান মানুষকে ক্রসফায়ারে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন, তখন জনগণের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় পুলিশের কাজ কি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাকি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার কাঠামো টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি চাইলেই কাউকে বিনা বিচারে হত্যা করার আদেশ দিতে পারে? বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমতি দিতে পারে? সরকার এমন অনুমতি দিলেই কি পুলিশ বাহিনী সেই বেআইনি আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারে? আমরা দেখলাম, সরকারের নিয়োগ দেওয়া এই আইজিপি সরকারের অবৈধ আদেশ বাস্তবায়নে প্রস্তুত থাকার কথা বলছেন।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের আইজিপি মূলত বেনজীর, বিপ্লব ও হারুনদের উত্তরসূরি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। আপনারা জানেন, গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, কীভাবে উচ্চাভিলাষী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত কিছু পুলিশ কর্মকর্তা জুনিয়র কর্মকর্তাদের ব্যবহার করেছেন। এসব ক্ষমতালিপ্সু কর্মকর্তা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন, অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার বানিয়েছেন। মূলত আলী হোসেন ফকির তাদের থেকে ব্যতিক্রম নন। তিনিও তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের হাতিয়ার বানাতে চাইছেন। অথচ এসব কর্মকর্তার লোভের বলি হন মাঠপর্যায়ের জুনিয়র পুলিশ সদস্যরা। দিনশেষে তাদেরই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়, বিচারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অন্যদিকে, বেনজীর ও হারুনের মতো প্রভাবশালী কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
এনসিপি নেতা হাসনাত বলেন, আলী হোসেন ফকিরও কিছুদিন আগেও দেশের বাইরে ছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় এসে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইজিপি পদে নিয়োগ দিয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের পর দেশে ফিরে তারাও আবার বেনজীর, হারুন ও বিপ্লব হতে চাইছেন। কিন্তু কোনো বিপদ এলে, আজ যিনি দম্ভের সঙ্গে ক্রসফায়ারের কথা বলছেন, তিনিও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন। অবৈধ অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে বেনজীর-হারুনদের মতো পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার আলোকে এই প্রবণতা স্পষ্ট।
তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন ছিল। অথচ আমরা দেখছি, যে ব্যক্তির নেতৃত্বে এই সংস্কার হওয়ার কথা, সেই শীর্ষ ব্যক্তিই আজ মানুষকে গুলি করে হত্যার মনোবাসনা ব্যক্ত করছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেশে আবারও ভয়ের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। অধীনস্থ কর্মকর্তাদের দিয়ে গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মতো বেআইনি কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি হয়তো রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণ করতে কিংবা মন্ত্রীদের প্রিয়ভাজন হতে এসব করতে চাইছেন। কিন্তু যেসব জুনিয়র কর্মকর্তা এসব কাজে সহায়তা করবেন, দিনশেষে তারাই বিপদে পড়বেন। কেউ চাকরি হারাবেন, কেউ আইন-আদালতের মুখোমুখি হবেন। আর ক্ষমতার পালাবদল হলে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারাও বেনজীর-হারুনদের মতো অন্য কোনো দেশে পাড়ি জমাতে পারেন। পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার আলোকে এই চিত্র স্পষ্ট।
‘তাই মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের প্রতি আমার আহ্বান—আপনারা যারা নিজেদের শ্রম, মেধা ও পেশাদারত্ব দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন এবং যাদের মনে বেনজীর, হারুন কিংবা বিপ্লব হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই, তারা মনে রাখবেন, আইন ও বিধিবহির্ভূত কোনো পদক্ষেপ নিতে আপনারা বাধ্য নন। যে সিদ্ধান্ত আইনসিদ্ধ নয়, তা বাস্তবায়ন করতেও আপনারা বাধ্য নন। কোনো উচ্চাভিলাষী, দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বেআইনি আদেশ পালন করতে গিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত মর্যাদা বিসর্জন দেবেন না। অন্য কারও স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হবেন না। জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অংশ নেবেন না। এতে আপনাদের পেশাগত শপথের অবমূল্যায়ন হবে। আপনাদের শপথ হচ্ছে রাষ্ট্রের সংবিধান, আইন এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষা করা। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার হাতিয়ার হওয়ার জন্য আপনারা শপথ নেননি।’
‘তৃণমূল ও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সম্মানিত পুলিশ সদস্যদের প্রতি আমাদের অপরিসীম শ্রদ্ধা রয়েছে। আপনারা নিজেদের শ্রম, মেধা ও পেশাদারত্ব দিয়ে পুলিশকে বারবার জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আপনাদের মনে রাখতে হবে, পেশাগত মর্যাদা কোনো আইজিপি কিংবা রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল নয়। আপনাদের মর্যাদা নির্ভর করে আইনের প্রতি আনুগত্য, ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জনগণের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর। জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের একটি বিষয় স্পষ্টভাবে শিখিয়েছে—পুলিশ কোনো দলীয় বাহিনী নয়। পুলিশ বিএনপির নয়, জামায়াতের নয়, এনসিপির নয় কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলেরও নয়। পুলিশ জনগণের। জনগণের মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করাই পুলিশের কাজ।’
শেষে তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন বিদ্যমান থাকলে ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার ইচ্ছা প্রকাশের পর আইজিপি আলী হোসেন ফকির তার চেয়ারে থাকতে পারতেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠত। কিন্তু আইনের শাসনের ঘাটতির কারণেই তিনি এখনো তার পদে রয়েছেন বলে আমি মনে করি। যে আইজিপি ক্রসফায়ারের বাসনা লালন করেন, তিনি মূলত হারুন, বিপ্লব কিংবা বেনজীরদের পথেই হাঁটছেন। এই ‘ক্রসফায়ার ফকির’ পুলিশপ্রধান কোন নৈতিক ভিত্তিতে তার বাহিনীর সামনে দাঁড়াবেন, সেটিই এখন আমাদের জানার আগ্রহ। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অন্ধকার অধ্যায়ে ফিরে যেতে চায় না। কোনো সরকার, আইজিপি কিংবা ক্ষমতাধর কর্মকর্তার ইচ্ছা জনগণের জীবন ও আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। পুলিশকে তাই জনগণের পাশে থাকতে হবে, ক্ষমতার পাশে নয়।
আলী হোসেন ফকির, আপনার অবগতির জন্য বলছি, একজন আইজিপি তার বাহিনীকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাখার শপথ নেন, সরকারের ইচ্ছার মধ্যে নয়। যিনি এই পার্থক্য বোঝেন না কিংবা বুঝেও প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন, তাঁর এই পদে থাকার নৈতিক ভিত্তি আদৌ আছে কি না, সেই প্রশ্ন আপনার কাছে রইল।







