বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব অভিযোগ তোলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
‘সবার আগে বাংলাদেশ নয়, বরং সবার আগে বিএনপি এই নীতিতে দেশ পরিচালনা করছে সরকার বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব অভিযোগ তোলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, প্রকৃত সার ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করে দলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যদের আত্মীয়-স্বজনদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সবার আগে বাংলাদেশ নয়, বরং সবার আগে বিএনপি এই নীতিতে দেশ পরিচালনা করছে সরকার।
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘সারের ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা ও নীতিমালার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। এমনকি টাকার বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ভাগ-বাটোয়ারা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, দেশে সংকটের কোনো অন্ত নেই। যেখানেই ধরতে যাওয়া হয়, সেখানেই সংকট। যখন কোনো বিষয় জাতির কাছে একেবারেই অপরিহার্য ও অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন কথা না বললেই নয়। রাজনৈতিকভাবে সভা-সমাবেশে বক্তব্য ও বিবৃতির মাধ্যমে তারা এসব বিষয় তুলে ধরেন। বিশেষ করে দেশে সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ নিয়ে চরম অব্যবস্থাপনা এবং দলীয়করণ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে জনগণের চরম ভোগান্তি ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, প্রশাসনের নৈতিকতা ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর।
সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নৈরাজ্যের অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সার আমদানি, উৎপাদন, বিতরণ, ব্যবহার ও ডিলার নিয়োগের বিষয়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে প্রণীত রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ এবং এর অধীন অ্যালোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী সারসংক্রান্ত বিষয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। আগে একাধিকবার নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করা হয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও এ বিষয়ে নীতিমালা ছিল। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে আবার সেই নীতিমালা সংশোধন করেছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। উপজেলা ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব অবাধ হয়েছে। উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির ১০ জন সদস্যের মধ্যে তিনজনকে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। একইভাবে জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির ১৩ জন সদস্যের মধ্যে তিনজনকে রাজনৈতিক বিবেচনায় মনোনীত করা হয়েছে। এভাবে ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এমন নীতিমালার প্রয়োগে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যবসায়ীদের ডিলার হওয়ার সুযোগ থাকছে না।
তিনি বলেন, এক পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে ডিলারশিপ দেওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে যে এলাকায় ব্যবসা নেই বা যিনি ওই এলাকার বাসিন্দা নন, তার অন্য এলাকায় ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নীতিমালায় বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু এসব শর্ত একের পর এক লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে প্রায় পাঁচ হাজার ডিলার নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে আগের ডিলাররাও থাকবেন। পাঁচ হাজার ডিলারশিপের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনকারীর যোগ্যতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং নিজস্ব গুদাম থাকার মতো শর্ত পূরণ করার কথা থাকলেও সেগুলো যথাযথভাবে মানা হয়নি।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, দীর্ঘদিনের সার ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে নেতাদের এবং সংসদ সদস্যদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও আত্মীয়স্বজনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। কিছু এলাকায় দলীয় প্যাডে স্বাক্ষর করা তালিকাও গ্রহণ করা হয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দুর্নীতি ও দলীয়করণে নিমজ্জিত সরকারের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার হতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তারা দুর্নীতিমুক্ত, স্বজনপ্রীতিমুক্ত, ভিন্নমতের ওপর দলীয় নিপীড়নমুক্ত, সমৃদ্ধ, মানবিক ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার মতো কর্তৃত্ববাদী সাংবিধানিক কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত হয়েছে ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায়ে সংবিধান সংস্কারের যে আইনি কাঠামো অনুমোদিত হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে তারা সংবিধান সংস্কার করতে চান। কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করে কর্তৃত্ববাদী শাসনের আদলে সাংবিধানিক কাঠামো সাজাচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পার্লামেন্টকে কেন্দ্র করে সংবিধান সংশোধনের নামে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে। এর লক্ষ্য আজীবন ক্ষমতায় থাকার চিন্তাকে এগিয়ে নেওয়া। ক্ষমতাসীনদের এই সর্বনাশা ও অপরিণামদর্শী পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশন ডাকা হয়েছে। এখনো আলোচনার সুযোগ রয়েছে। সংসদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের আলোচনার জায়গা। এসব বিতর্ক রাজপথে ঠেলে না দিয়ে সংসদে নিষ্পত্তি করা উচিত।
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের জন্য সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
দাবিগুলো হলো-
১. সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের যেসব অভিযোগ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে, সরকারকে অবিলম্বে সেগুলোর তদন্ত করতে হবে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
২. নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের যোগ্যতা মূল্যায়নের মানদণ্ড, তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং লাইসেন্স দেওয়ার ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
৩. ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে যাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও অর্থের পরিমাণ তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. সারের কৃত্রিম সংকট নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য এবং জামায়াত ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের এলাকার সারসংকট সম্পর্কে দেওয়া তথ্য প্রকাশ করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী কেন এ বিষয়ে অসত্য তথ্য দিয়েছেন, তা-ও স্পষ্ট করতে হবে।
৫. সার ডিলার নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি জনগণকে জানাতে হবে।
৬. কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। ভিত্তিহীন অভিযোগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে কাউকে দায়ী করা যাবে না।







