ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কার শেষে অবশেষে চালু হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বক্তব্য দেওয়া পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি এ সংগ্রহশালায় অন্তর্ভুক্ত এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। একইসাথে, অবিলম্বে জিন্নাহর ছবি অপসারণ ও শেখ মুজিবের ছবি পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে এ সংগঠন।
সংগঠনটি বলছে, ‘মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি সংযোজন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল সময়ের ছবি অপসারণের মধ্য দিয়ে ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা করছে গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধী সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির নেতৃত্বাধীন ডাকসু।’
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা এবং সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন শুভ এক যৌথ বিবৃতিতে এসব মন্তব্য করেন।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী জনগণের উপর জোরপূর্বক উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে তিনি ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় বলেছিলেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তৎকালীন পাকিস্তানের ৫৬ ভাগ বাংলা ভাষাভাষী জনগণ এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষার দাবি আদায় করেছিল।”
এতে আরও বলা হয়, “যেই ব্যক্তি বাঙালিদের উপর নিপীড়নের বীজ বপন করেছিলেন, তার ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় স্থান পাওয়ার মানে হল বাঙালীর মুক্তিসংগ্রামকে মুছে ফেলার চেষ্টা। অপরদিকে শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা। এদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস থেকে তাকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর তার শাসনামল নিয়ে নির্মোহ পর্যালোচনা হতে পারে, কিন্তু তাকে জোর করে মুছে ফেলার চেষ্টা ইতিহাস বিকৃতির শামিল।”
শিবিরকে ইতিহাসবিকৃতকারী আখ্যা দিয়ে নেতারা বলেন, “ইতিহাস বিকৃতির ধৃষ্টতা দেখিয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধী সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির নেতৃত্বাধীন ডাকসু। ইতিহাসে যার যে স্থান প্রাপ্য তাকে সেই স্থান দিতে হবে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট অবিলম্বে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর অপসারণ করে শেখ মুজিব রহমানের ছবি পুনর্বহালের দাবি জানাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবির প্রতি কর্ণপাত না করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
এর আগে, গতকাল রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ডাকসু সংগ্রহশালার সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। সংস্কার কাজের সার্বিক তত্ত্ববধানে ছিলেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেন, জিএস এস. এম. ফরহাদ, রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শরিফুল ইসলাম, ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, ডাকসুর সাবেক ভিপি জনাব বদরুল আলমের কন্যা ফারজানা আলম ও তার পরিবার, ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দ সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
এসময় ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের ইতিহাসের সঙ্গে ডাকসুর ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের অনেক স্মৃতি ও নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য ডাকসুর সংগ্রহ শালা রয়েছে। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সংগ্রহশালা জরাজীর্ণ অব্স্থায় ছিল। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পরে সেটি আরও অত্যাধুনিক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করি। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সেটির সংস্কার কাজ শেষে উদ্ধোবন করা হলো।”
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ অবহেলা ও ফ্যাসিবাদের দখলে অকার্যকর থাকা ডাকসু সংগ্রহশালাটিকে সংস্কার করে ১৯০৫ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যেখানে ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং ফ্যাসিবাদ আমলের বিভিন্ন গণহত্যা ও জুলাই বিপ্লবের দুর্লভ দলিল, চিত্র ও শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১৯২১ সাল থেকে শুরু হওয়া ৩৯টি ডাকসুর ইতিহাস এবং সাবেক ভিপি-জিএসদের নামসহ অনার বোর্ড এখানে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংগ্রহশালাটি আরও সমৃদ্ধ করতে দেশবাসী ও গবেষকদের কাছে ঐতিহাসিক দলিলপত্র এবং জুলাই বিপ্লবের দুর্লভ চিত্র সংগ্রহশালায় জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ডাকসুর উদ্যোগে এটি বাংলাদেশের অন্যতম একটি তথ্যবহুল, ডেকোরেটেড ও সুগোছানো সংগ্রহশালা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।”
ডাকসুর জিএস এস. এম. ফরহাদ বলেন, “১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ অবহেলা ও প্রায় ময়লার স্তূপে পরিণত হওয়া ডাকসু সংগ্রহশালাটিকে ডাকসুর উদ্যোগে ফাতেমা তাসনিম জুমার তত্ত্বাবধানে সংস্কার করে আজ উদ্বোধন করা হয়েছে। সংগ্রহশালাটিতে প্রাচীন ইতিহাস ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২৪-এর জুলাই বিপ্লব এবং ২০০৯ থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ ক্রোনোলজিক্যাল আকারে তুলে ধরা হয়েছে। তবে কিছু ভিপির ছবিসহ এখনও কিছু ঘাটতি থাকায় আগামী এক সপ্তাহকে কারেকশনের সময় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কারো কাছে কোনো তথ্য, ছবি বা কারেকশনের পরামর্শ থাকলে তা জানানোর জন্য আহ্বান করছি।”
ডাকসুর সাবেক ভিপি বদরুল আলমের (সেশন-১৯৫৭-৫৮) কন্যা ফারজানা আলম বলেন, “ডাকসু সংগ্রহশালাটিকে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব ছাড়াই ১৯৫৭ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইতিহাস ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে অত্যন্ত সুন্দর, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের আগের প্রজন্মের মুরব্বিদের ডাকসুর সাথে সম্পৃক্ততা, কাজ, প্রতিকূলতা ও সাফল্য সম্পর্কে জানতে পারবে। তখনকার ছাত্র প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে ছাত্র সমাজের কথা তুলে ধরেছিলেন এবং বর্তমানের এ সংস্কারের ফলে পরবর্তীকালে যে দল বা মতের প্রতিনিধি আসুক না কেন, কেউ এই ইতিহাসকে অবহেলা করতে পারবে না। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কোনো একক দল কিংবা মতের লোককে প্রধান্য না দিয়ে প্রকৃত ও সত্য ইতিহাসগুলো তুলে ধরার জন্য এবং সত্য ও সুন্দর কাজটি সম্পন্ন করার জন্য ডাকসুর প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”







