২৩শে এপ্রিল, ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ রিপোর্ট করে যে, ‘যুদ্ধ-পরবর্তী বিশৃঙ্খলার পটভূমিতে গাজা উপত্যকায় প্রতি সপ্তাহে কয়েক ডজন শিশু নিখোঁজ হচ্ছে’। নিঃসন্দেহে এটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান মার্কিন-সমর্থিত গণহত্যার এক অদ্ভুত দৃষ্টান্ত। যা গত বছর নামমাত্র বাস্তবায়িত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
প্রবন্ধটি শুরু হয়েছে চার বছর বয়সী মোহাম্মদ ঘাবানকে দিয়ে, যে এপ্রিলের শুরুতে উত্তর গাজা থেকে নিখোঁজ হয়েছিল, ‘(সে) তার বাস্তুচ্যুত পরিবারের তাঁবুর সামনে তার ভাইয়ের সাথে খেলছিল। সে ভেতরে গেল, একটু উষ্ণ আলিঙ্গন নিল, তারপর স্যান্ডেল পরে বাইরে বেরিয়ে এল আর হারিয়ে গেল।
লেখক ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর দ্য মিসিং অ্যান্ড ফোর্সিবলি ডিসঅ্যাপিয়ারড থেকে প্রাপ্ত একটি অনুমানের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে ২,৯০০ শিশু যুদ্ধের সময় নিখোঁজ হয়েছে। যাদের মধ্যে ২,৭০০ জনের লাশ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং বাকি ২০০ জন কেবল নিখোঁজই রয়েছে।
এই ধরনের পরিসংখ্যান ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর কার্যপ্রণালীর সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ, যারা সরকারি হতাহতের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় ৭২,৫০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং আরও হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ গত সেপ্টেম্বরে সতর্ক করেছিলেন যে, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ৬ লক্ষ ৮০ হাজারের কাছাকাছি হয়ে থাকতে পারে।
গুমের প্রসঙ্গে বলতে গেলে, ফেব্রুয়ারিতে আল জাজিরা আরবির একটি অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয় যে , যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজা উপত্যকায় অন্তত ২,৮৪২ জন ফিলিস্তিনি "উধাও" হয়ে গেছেন। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা দলগুলো এই ঘটনার জন্য ইসরাইলের মার্কিন -নির্মিত থার্মাল ও থার্মোবারিক অস্ত্রের ব্যবহারকে দায়ী করে, যা কার্যকরভাবে মানবদেহকে বাষ্পীভূত করে ফেলে।
ভয়াবহ এই পরিসংখ্যানটি দ্রুতই আড়ালে পড়ে যায় যখন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলের যৌথ হামলা আঞ্চলিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। কেননা গত দুই মাস ধরে সংবাদ মাধ্যমগুলোর অধিকাংশ সময়ই দখল করে রেখেছে এই ইস্যু।
সেই সময়ে আল জাজিরাকে দেওয়া এক মন্তব্যে, বেসামরিক প্রতিরক্ষা মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল ইসরাইলি হামলায় লক্ষ্যবস্তু হওয়া বাড়িগুলো থেকে বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়া নিহতদের সংখ্যা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো পরিবার আমাদের জানায় যে ভেতরে পাঁচজন লোক ছিল, এবং আমরা কেবল তিনটি অক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করি, তাহলে আমরা বাকি দুজনকে ‘বাষ্পীভূত’ হিসেবে তখনই গণ্য করি। এছাড়া ব্যাপক তল্লাশির পরেও দেয়ালে রক্তের ছিট বা মাথার খুলির মতো ছোট ছোট টুকরোর মতো জৈবিক চিহ্ন ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না।’
বাষ্পীভূত দেহ:
এই ভয়াবহ তথ্যগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাদের তথাকথিত 'রেকর্ড সংশোধন' করার জন্য অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে একটি অহংকারী বিবৃতি জারি করে।
আল জাজিরার ‘গাজাবাসীদের লাশ বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার’ দাবিকে মিথ্যা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। সেনাবাহিনী জোর দিয়ে জানায় যে, তারা ‘কেবলমাত্র বৈধ অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে’। তারা আরো দাবি করে যে, তাদের হামলাগুলো ‘আন্তর্জাতিক আইন মেনেই কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে চালানো হয় এবং বেসামরিক নাগরিক ও তাদের সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে সব ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’
অবশ্যই এটা স্পষ্ট নয় যে, যে সামরিক বাহিনী প্রায় ৭ লাখ মানুষকে হত্যা করার দায়ে অভিযুক্ত। আর যারা কোনোরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই গোটা পরিবার ও এলাকা নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তারা এই পুরো 'বাষ্পীভবন' ব্যাপারটিতে কেন এত বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ হলো।
এটা ঠিক যে, গণহত্যার প্রকৃত মাত্রা লুকানোর জন্য বাতাসে লাশ গায়েব করে দেওয়া একটা বেশ ভালো উপায়। এবং ফিলিস্তিনিদের দেহ 'বাষ্পীভূত' হয়ে যাওয়ার বিষয়টি হয়তো 'এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স' বা গুমের আনুষ্ঠানিক আইনি সংজ্ঞার সাথে হুবহু মিলবে না, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে এটি ঠিক তা-ই।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের ওয়েবসাইট অনুসারে , ‘ গুম বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের প্রতিনিধি অথবা রাষ্ট্রের অনুমোদন, সমর্থন বা মৌন সম্মতিতে কর্মরত কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক গ্রেপ্তার, আটক, অপহরণ বা অন্য কোনো উপায়ে স্বাধীনতা হরণ, এবং এর পরবর্তীকালে সেই স্বাধীনতা হরণকে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানানো অথবা গুমকৃত ব্যক্তির ভাগ্য বা অবস্থান গোপন করা, যার ফলে ওই ব্যক্তিকে আইনের সুরক্ষার পায় না।
তবে, গাজায় ইসরাইলের এই প্রকাশ্য ‘অদৃশ্য করে দেওয়ার’ নাটকের পরিপ্রেক্ষিতে, গুম বা ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’-এর সেই সংজ্ঞাকে যথেষ্ট পরিমাণে বিস্তৃত করা এখন সময়ের দাবি।
তবুও ইসরাইল প্রচলিত ধরনের গুমের জন্যও দোষী। গত আগস্টে, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সেইসব প্রতিবেদনের নিন্দা জানিয়েছেন যেখানে বলা হয়েছে যে, কুখ্যাত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন পরিচালিত ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলো থেকে একটি শিশুসহ ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের গুম করা হচ্ছে ।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট এই সংগঠনটি খাবার এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসের খোঁজে জড়ো হওয়া নিরুপায় মানুষদের ওপর গণহত্যা চালাতেও বিশেষ পারদর্শী ছিল।
এদিকে, গাজা ও পশ্চিম তীর উভয় স্থানেই গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল কর্তৃক চিকিৎসাকর্মী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য সব ধরনের মানুষের জোরপূর্বক গুম হওয়ার ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে—অবশ্য, এমনটা যে আগেও স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না, তা নয়।
বৈশ্বিক প্যাটার্ন:
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্বের বহু স্থানে জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় জড়িত থেকেছে, যার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সময় লাতিন আমেরিকা জুড়ে রক্তপিপাসু ডানপন্থী শাসনব্যবস্থাগুলোকে সাহায্য ও প্ররোচনা দেওয়াও অন্তর্ভুক্ত।
আর্জেন্টিনা, গুয়াতেমালা এবং এর বাইরেও হাজার হাজার মানুষ গুম হয়ে গিয়েছিল, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই গোলার্ধকে পুঁজিবাদকে মহৎভাবে নিরাপদ করার কাজে লিপ্ত ছিল।
মেক্সিকোতে ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ গুম হয়েছেন, যাদের সিংহভাগই ২০০৬ সালে মার্কিন-সমর্থিত 'মাদকবিরোধী যুদ্ধ' শুরু হওয়ার পর নিখোঁজ হন, যেটিকে গরিবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবেই অধিকতর যথাযথভাবে আখ্যায়িত করা যায়।
কিন্তু মেক্সিকো থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত, নিখোঁজ হওয়া মানুষের সংখ্যা দিয়ে নিপীড়নের ব্যাপকতা বোঝানো যায় না। নিখোঁজদের পরিবারগুলোও ভুক্তভোগী; প্রিয়জনদের ভাগ্যের ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় তারাও এক অনির্দিষ্ট মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে বাধ্য হন—যে তথ্য ছাড়া শোক পালন শুরু করা কিংবা জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্বস্তি লাভ করা অসম্ভব।
গাজায় ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে, এটা বলা কঠিন যে আপনার প্রিয়জন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন—এই জ্ঞানটি শেষ পর্যন্ত আপনাকে মানসিক শান্তি দিতে যথেষ্ট কি না। সর্বোপরি, কোনো চিহ্ন না রেখে জোরপূর্বক গায়েব হয়ে যাওয়ার মধ্যে খুব একটা বাস্তব কিছু থাকে না।
প্রকৃতপক্ষে, আল জাজিরা ফিলিস্তিনি বাবা রফিক বদরানের উদ্ধৃতি দিয়ে সেই অকল্পনীয় মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেছে, যা গুমের এই ভয়ংকর নতুন সংজ্ঞার (বাষ্পীভূত হওয়া) সাথে জড়িয়ে আছে: আমার চার সন্তান স্রেফ বাষ্প হয়ে মিলিয়ে গেল, অশ্রু সংবরণ করে বদরান বলছিলেন। 'আমি লক্ষ বার তাদের খুঁজেছি। একটি টুকরোও অবশিষ্ট নেই। তারা কোথায় গেল?
এখন, যখন আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এবং অস্ত্র শিল্প বিশাল মুনাফা লুটছে, বিশ্ববাসীর পক্ষে ফিলিস্তিনিদের অনন্য দুর্দশাকে উপেক্ষা করা আরো সহজ হয়ে পড়েছে — যার অর্থ হলো, এই গণহত্যাও কার্যত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, অবশ্যই, ইসরাইলি লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ধারণাকেই বলপূর্বক নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ইসরাইলের জন্য, তার রক্তাক্ত ইতিহাস এত সহজে গোপন করা যাবে না। (মিডল ইস্ট আই)







