আমার মেয়ে বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়

Post Image

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শহীদ মেহরুন নেছা তানহার বাবা মোশারফ হোসেন বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমার স্ত্রী ফোন করে বলে আমার মেয়ের শরীরে গুলি গেলেছে। তখন আমি দৌড়ে বাসায় যাই। গিয়ে দেখতে পাই আমার মেয়ে বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, বাসার ফ্লোর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তখনও আমার মেয়ে জীবিত ছিল।

বৃহস্পতিবার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয়তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার বিচার চলছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- অবসরপ্রাপ্ত জেলা ওদায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ ও জেলা দায়রা জজ নুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির।

জবানবন্দিতে শহীদ তানহার বাবা বলেন, আমার মেয়ে মিরপুর শাহ আলী কলেজে অনার্স ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। তানহা আমার একমাত্র মেয়ে। আমার আরেকজন ছেলেও আছে। ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আমার দুই ছেলে মেয়েই অংশ নিয়েছিল। আমি তাদেরকে প্রায়ই আন্দোলনে যেতে নিষেধ করতাম। ১৯ জুলাই আমার ছেলে-মেয়ের মামাতো ভাই আকরাম খান রাব্বী মিরপুর-১০ এলাকায় শহীদ হয়। তারপর থেকে আমার ছেলে-মেয়েকে আর ঘরে আটকে রাখা যায়নি।। আমরা এবং শহীদ আকরাম খান রাব্বীর পরিবার একই ভবনে থাকি।

জবানবন্দিতে মোশারফ হোসেন বলেন, ৫ আগস্ট ২০২৪ যখন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তখন আমার ছেলে ও মেয়ে বিজয় মিছিল নিয়ে গণভবনে যায়। সন্ধ্যা হওয়ার পরেও মেয়ে ফেরত না আসায় আমি আমি ছেলে-মেয়েকে ফোন করে বলি আমাদের বাড়ির আশেপাশে গোলাগুলি হচ্ছে, তোমরা পিছন দিকের রাস্তা দিয়ে চলে আসো। মেয়েকে আবার ভিডিও কল দিয়ে কথা বলার সময় আমি তার এক হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেল ও অন্য হাতে একগুচ্ছ ফুলসহ দেখতে পাই। এরপর ছেলেকে ফোন দিয়ে ব্যস্ত পাই। ওই সময় আমার মেয়ে তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিল। আমার মেয়ে তার ভাইকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসতে বলে। এর ঠিক ১/২ মিনিট পরে আমার স্ত্রী ফোন দিয়ে বলে তানহা এর শরীরে গুলি লেগেছে। আমি এবং তানহার মামা ফারুক ভাই দৌড়ে বাসায় যাই। বাসায় গিয়ে দেখতে পাই আমার মেয়ে বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে, বাসার ফ্লোর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তখনও আমার মেয়ে জীবিত ছিল। আমি এবং ফারুক ভাই মেয়েকে কোলে করে নীচে নামিয়ে আনি। আমার শরীর মেয়ের রক্তে ভিজে যায়। ওই সময় আমার ছেলে বাসায় ফিরে আসে। আমার ছেলের সঙ্গে যখন মেয়ে ফোনে কথা বলছিল তখন মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয় এবং একটি চিৎকার করে। আমার ছেলে মোবাইলে ওই চিৎকার শুনতে পায়।

জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেন, এরপর আমি এবং আমার ছেলে আব্দুর রহমান তারিফ মেয়েকে মিরপুর আলোক হাসপাতালে নিয়ে যাই। আনুমানিক ৪/৫ মিনিট পরেই ডাক্তার আমার মেয়ে তানহা মৃত বলে জানায়। আমরা লাশ গুম হয়ে যাওয়ার ভয়ে সঙ্গে সঙ্গেই লাশ এ্যাম্বুলেন্সে করে বাসায় নিয়ে আসি। পরে পূর্ব বাইশটেকি কবরস্থানে নিজ হাতে দাফন করি। আমার মেয়ে তানহা যখন গুলিবিদ্ধ হয় তখন আমার বাসায় সাবলেট থাকা একজন মহিলাও গুলিবিদ্ধ হন।

শহীদ তানহার বাবা বলেন, আমার মেয়ে তানহা ও তার মামাতো ভাই রাব্বী হত্যার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, সাদ্দাম, ইনান, আরাফাত, বাহাউদ্দিন নাছিম ও স্থানীয় এমপি নিখিলকে দায়ী করি। ওবায়দুল কাদের বলেছিল, রাস্তায় নামলে দেখা মাত্র গুলি করা হবে। আমাদের আওয়ামীলীগ বাহিনী যথেষ্ট। এছাড়াও ওবায়দুল কাদের বিভিন্নভাবে আরো উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন, যা আমি ফেসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি। যারা আমার মেয়ে তানহাসহ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, অসংখ্য ছেলে মেয়েকে অন্ধ করেছে, পঙ্গু করেছে, তাদের সকলের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি চাই।

গতকাল দুজন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। অপরজন শহীদ আকরাম খান রাব্বীর বাবা মো. ফারুক খান। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমি শহীদ আকরাম খান রাব্বীরা বাবা এবং শহীদ তানহার মামা। আমার ছেলে আকরাম খান রাব্বী ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ পপুলার হাসপাতালের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়। ওইদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ফোন কলে জানতে পারি আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার বড় ছেলেকে নিয়ে রওনা করি। তখন আরেকটি ফোন কলে জানতে পারি আমার ছেলেকে মিরপুর-১১ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে আবার একটি ফোন কলে জানতে পারি আমার ছেলেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে ছেলেকে মৃত অবস্থায় পাই। আমি লাশ আনার জন্য চেষ্টা করলে আমাকে বলা হয় পুলিশের অনুমতি ছাড়া দেওয়া যাবে না। আমি ওই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ছেলের লাশ ডিপ ফ্রিজে রেখে আসি।

জবানবন্দিতে ফারুক খান বলেন, পরের দিন ২০ জুলাই ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে ডিপ ফ্রিজে ছেলের লাশ খুঁজে পাইনি। পরে মর্গে গিয়ে একসঙ্গে ৫/৬ টি লাশের সঙ্গে স্তূপ করে রাখা অবস্থায় পাই। ২১ জুলাই কাফরুল থানার সহযোগিতায় ছেলের লাশ পোস্টমর্টেম শেষে ওইদিন আসরের পর পূর্ব বাইশটেক কবরস্থানে দাফন করি।

আমি আমার ছেলে রাব্বী ও ভাগনি তানহা এর হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী আরাফাত, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম, সাধারণ সম্পাদক ইনান এবং যুবলীগের সভাপতি পরশ ও সাধারণ সম্পাদক নিখিলকে দায়ী করি।

এই বিভাগের আরও খবর

সারাদেশ

News Image

ফিলাডেলফিয়ায় বৈশাখী মেলা

সোমবার, ৩০ জুন, ২০২৫

সর্বশেষ খবর

ভিক্ষা করে ছেলের চিকিৎসা করাইছি, এখন খোঁজও নেয় না: হাফেজ তাশরীফের বাবা

হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে মারধর, সেই ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার

‘এই মুহূর্তে গণঅধিকার পরিষদ সরে গেলে বিএনপির ভিত নড়ে যাবে’

এক্সিলেন্ট গ্রুপের নতুন উপদেষ্টা হলেন ডব্লিউএইচআরও চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আমিন

আমরা নিরপরাধ, অভিযোগ প্রত্যাহার চাই : পলক

কর্ণফুলী নদীতে মিললো নিখোঁজ যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ

লাইভে এসে বিএনপির সমালোচনা, পুলিশ হেফাজতে নারী উদ্যোক্তা

ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক

সর্বাধিক পঠিত

বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বজ্রপাত নিরোধক স্থাপনের দাবি জামায়াতের

বিএনপির উদ্দেশে ফরহাদ: আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের চরিত্র কপি করবেন না

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে প্রবাসীদের মতবিনিময়

হামের টিকা না পাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দেব: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ঈশ্বরদীতে আমির হামজার মাহফিল ঘিরে থানায় স্মারকলিপি দিলো ছাত্রদল

হামে শিশুমৃত্যু রোধে জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি ইনকিলাব মঞ্চের

গাজীপুরে অস্ত্র ও গাঁজাসহ বিএনপি নেতার ভাই-ভাতিজা আটক

‘মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ না থাকলে গেরুয়ার প্রভাব প্রতিহত করা কঠিন হবে’

বগুড়ায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ও তার ভাইকে কুপিয়ে জখম

সৌদি আরবে পৌঁছেছেন প্রায় ৩৫ হাজার বাংলাদেশি হজযাত্রী