গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি, সেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, মতপ্রকাশের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত, বৈষম্য ও দুর্নীতি দূর এবং দেশের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা থাকলেও গত সাত-আট মাসে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে জয়পুরহাট জেলা শহরের এক নম্বর স্টেশন রোড এলাকায় ‘স্বপ্নছায়া’ কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সাংগঠনিক অগ্রগতি পর্যালোচনা ও স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন বিষয়ে এ সভার আয়োজন করেন এনসিপির জয়পুরহাট জেলা শাখা।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী সমালোচনা ও মতপ্রকাশের কারণে ৩০ জনের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। সাংবাদিকসহ সরকারবিরোধী মত প্রকাশকারীদের অনেকেই গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন
তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় সরকার বাস্তবায়ন করছে না, বরং সাংবিধানিক ধারা সংশোধনের জন্য কমিটি করে পুরো সংশোধনপ্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছে। নির্বাচনের আগে ৭০ শতাংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান বাস্তবায়ন হয়নি। বাস্তবায়ন হয়নি বলেই আমাদের মাঠে নামতে হচ্ছে, কাজ করতে হচ্ছে। এটার জন্য এককভাবে বিএনপি দায়ী। বিএনপি গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কোনো কার্যক্রম করতে দেয় নাই। অন্তর্বর্তী সরকারকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। এখন নির্বাচিত হয়ে আসার পরেও একই কায়দায়, পুরনো স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় দেশ পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ডিসেম্বর মাসে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ সম্পন্ন হবে। এটি নবায়ন অথবা নতুন করে চুক্তি করার কথা ছিল। কিন্তু আমরা কোনো ধরনের কার্যক্রম দেখতে পাচ্ছি না দুই রাষ্ট্রের পক্ষে। তার মানে আমরা ধরে নিতে পারি যে এই ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন বা নতুন করে চুক্তি হবে না।
তিনি বলেন, যে চুক্তি ছিল সেই চুক্তিটিও অসম ছিল। তারপরও আমরা আমাদের পানি কিছুটা পেয়েছি। এখন চুক্তি না হলে সম্পূর্ণ রূপে ভারতের ইচ্ছাধীন হবে যে পদ্মা নদীতে পানি আসবে কি আসবে না। যে রকমটা তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে হয়। তার মানে পদ্মা নদীর দুই পার ঘিরে প্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস। কৃষকরা কৃষিক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে। তো সেইটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে ভারত। ভারত আমাদের এই নদীর মাধ্যমে, পানির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের বাংলাদেশকে শোষণ করে। এটি শোষণের বড় একটা হাতিয়ার
দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমাদের ধারণা এই গঙ্গা চুক্তি যাতে বাস্তবায়ন করা না লাগে, এই কারণে বাংলাদেশে নানা ধরনের অস্থিরতা ভারত করার চেষ্টা করছে। আর সেইটার একটা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করা। এই ধরনের একটা প্রোপাগান্ডা তারা বাজারে ফেলেছে। এটা আসলে আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা হিসেবে না, এটা দিল্লির প্রোপাগান্ডা হিসেবে দেখতে হবে। তারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায় নানা ক্ষেত্রে এবং এই অস্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে সুযোগটা করে দিচ্ছে সরকার। যার বড় একটা উদাহরণ হচ্ছে শ্রমিক আন্দোলন। শ্রমিকরা ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করতে নামছে। দেশে একটা সেনসিটিভ সময় আমরা পার করছি। সরকারের উচিত ছিল আলোচনা করে এটা দ্রুত সমাধান করা। কিন্তু সরকার এই আন্দোলনটাকে বাড়তে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক আন্দোলন শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ পর মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এরপরও কয়েক দিন মজুরি বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। আন্দোলন তীব্র হওয়ার পর সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এই গাফিলতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ আন্দোলনে নাশকতা করবে এবং চেষ্টা করেছে।
এনসিপি নেতা বলেন, ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ফেরার কোনো সুযোগ নাই। কিন্তু সরকার নানাভাবে আওয়ামী লীগকে কার্যক্রম করার সুযোগ করে দিচ্ছে, গত আট মাসে দিয়েছে। গত আট মাসে যদি বিচারের ব্যাপারে সরকার কম্প্রোমাইজ না করে এবং বিভিন্ন জায়গায় মামলা বাণিজ্য করে মামলা দিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিভিন্ন সাধারণ মানুষকে তারা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক নিয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপির বহু নেতাকে এটা আমরা বলতে শুনেছি যে, আওয়ামী লীগের মামলা তারা তুলে দেবে। তাদের স্টেজে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান হয়েছে।
তিনি বলেন, ডিসেম্বর মাসে আমরা মাঠে থাকবো, বাংলাদেশের জনগণ মাঠে থাকবে। এটা আমাদের বিজয়ের মাস এবং আমরা নদীর পানি নায্য হিস্যা আদায়ের জন্য আমরা রাজপথে থাকবো।
সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সাংগঠনিক রিপোর্ট নিচ্ছি, পর্যালোচনা করছি। আমাদের সংগঠন প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিনিয়ত আমাদের ইউনিয়ন কমিটি, উপজেলা কমিটি, জেলা কমিটিগুলো পূর্ণ করে তুলছে। আমাদের প্রায় এখন ১৫টির অধিক অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠন রয়েছে। একটা সংগঠনে অনেকেই যুক্ত হবেন আবার অনেকে ভালো না লাগলে চলেও যেতে পারেন। একটা সংগঠনে এইটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। আমরা আমাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতেই এগোচ্ছি এবং এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা এককভাবে নির্বাচন অংশগ্রহণ করবো।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জোনায়েদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন, জয়পুরহাট জেলা এনসিপির আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম রুঞ্জু, সদস্য সচিব ইসমাঈল হোসেন হাদী প্রমুখ।







