২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ভূমিকা নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বলেছেন, ‘আন্দোলনের ইতিহাসে কে সামনে ছিলেন আর কে পেছনে ছিলেন, সেই প্রতিযোগিতা নয়; বরং কে কী অবদান রেখেছেন, তার স্বীকৃতিই হওয়া উচিত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ আন্দোলন সফল হয় সম্মিলিত শক্তিতে, আর সেই শক্তি টিকে থাকে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে।’
তিনি বলেছেন, ‘কোনো বড় আন্দোলন কেবল দৃশ্যমান নেতৃত্ব দিয়ে সফল করা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, সমন্বয়, কৌশল, লজিস্টিকস এবং অসংখ্য মানুষের নিরলস শ্রম।’
গতকাল রবিবার (০১ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজ অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, “জীবনের একটা বড় সময় রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কেটেছে। ২০০৬ সাল থেকে শিবিরের কর্মী হিসেবে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। দায়িত্ব পালনকালে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচন এবং একই বছরের অক্টোবরে শহীদ আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটের আন্দোলন খুব কাছ থেকে দেখেছি।”
তিনি বলেন, “২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সেক্রেটারি এবং ২০১৯ সালে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ফলে এসব ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে আমার ও আমাদের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ছিল। কাজ করেছি, সমর্থন দিয়েছি, লজিস্টিকস সহায়তা করেছি, নিজেরাও রাজপথে থেকেছি। কিন্তু এসব আন্দোলনের কোনোটিতেই আমি বা আমরা মেইন ফেইস ছিলাম না।”
এনসিপি নেতা বলেন, ‘‘২০২৩ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গিয়ে বুয়েটের কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর তাদের অভিভাবকদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করি। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন পান। এই ঘটনায় আমিই মেইন ফেইস ছিলাম। আমি জানি, সংবাদ সম্মেলনটি সবার নজরে এলেও এর পেছনের তিন দিনের দৌড়ঝাঁপ, মানসিক চাপ এবং পুরো প্রক্রিয়ায় যাঁরা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের ভূমিকা সামনে আসেনি।”
জুলাই নিয়ে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরাসরি রাজপথে সম্পৃক্ত ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক সভাপতি হিসেবে এস এম ফরহাদ, সাদিক কায়েম ও সিবগাতুল্লাহর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলাম। একই সঙ্গে পূর্বপরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার সুবাদে আন্দোলনের সামনের সারির নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। ফলে আন্দোলনের সাংগঠনিক ও ব্যাকগ্রাউন্ড টিম এবং মেইন ফেইস—উভয় পরিসরের সঙ্গেই কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ৫ আগস্টের পরের সময়টাতে মূলত দৌড়েছি ও কাজ করার চেষ্টা করেছি। অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছি, কোথাও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করেছি।”
এ বিষয়ে আরও বলেন, “এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে আমার উপলব্ধি, কোনো বড় আন্দোলন কেবল দৃশ্যমান নেতৃত্ব দিয়ে সফল করা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, সমন্বয়, কৌশল, লজিস্টিকস এবং অসংখ্য মানুষের নিরলস শ্রম। একইভাবে শুধু নেপথ্যের সাংগঠনিক শক্তি দিয়েও ব্যাপক গণসম্পৃক্ততা তৈরি করা যায় না। মানুষের সামনে কথা বলা, আস্থা তৈরি করা এবং আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকে জনপরিসরে তুলে ধরার জন্য ফেইস অপরিহার্য।”
সবার অবদানের স্বীকৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই দুই বাস্তবতাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। নেপথ্যের শক্তির কাজ সামনের নেতৃত্বের জায়গা দখল করে নিজেদের প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়। আবার দৃশ্যমান নেতৃত্বেরও উচিত নয় নেপথ্যে থাকা মানুষগুলোর অবদান অস্বীকার করা কিংবা তাদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়া।”
তিনি আরও বলেন, “আজ যাঁরা নেপথ্যে কাজ করছেন, আগামী কোনো আন্দোলনে তারাই হয়তো সামনের সারির নেতৃত্বে আসবেন। আবার আজকের দৃশ্যমান নেতৃত্বের কেউ ভবিষ্যতে নেপথ্যে থেকে সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে কাজ করবেন। নেতৃত্বের অবস্থান পরিবর্তনশীল, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অবদানের স্বীকৃতি থাকা জরুরি।”
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, দল কিংবা সাংগঠনিক শক্তির অর্জন নয়। এর পেছনে যেমন ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি, তেমনি সামনে ছিল অসংখ্য সাহসী তরুণ, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ ও নেতৃত্ব। এই সম্মিলিত বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কাউকে একক কৃতিত্ব দেওয়া কিংবা কাউকে পুরোপুরি অস্বীকার করা—দুটিই ইতিহাসের প্রতি অবিচার।”
আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, “আন্দোলনের ইতিহাসে কে সামনে ছিলেন আর কে পেছনে ছিলেন, সেই প্রতিযোগিতা নয়; বরং কে কী অবদান রেখেছেন, তার স্বীকৃতিই হওয়া উচিত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ আন্দোলন সফল হয় সম্মিলিত শক্তিতে, আর সেই শক্তি টিকে থাকে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে।”