বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জয় হাতছাড়া করেছে শক্তিশালী পর্তুগাল। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র করা ম্যাচের পর আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটাই নাম— ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন হলেও ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে ঘিরেই এখন প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
পর্তুগালের আক্রমণভাগ কি এখনো অতিরিক্তভাবে রোনালদোনির্ভর? নাকি সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের প্রতিভাদের ঘিরে দল গড়ার? বিশ্বকাপের শুরুতেই সেই বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে কড়া ভাষায় শিরোনাম করেছে, ‘দশজন খেলোয়াড় ও একজন স্ট্যাচু’। তাদের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, বর্তমান পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম হতে পারে রোনালদো।
ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই জো নেভেসের হেডে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। গোলের আগে টানা ছয় মিনিটে ৮৪টি পাস সম্পন্ন করে ইউরোপিয়ান দলটি, যেখানে ডিআর কঙ্গোর ছিল মাত্র ১২টি। শুরুতে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচে ফিরতে শুরু করে আফ্রিকান প্রতিনিধিরা। প্রথমার্ধের শেষ দিকে কর্নার থেকে উয়োনে উইসার গোলে সমতায় ফেরে তারা।
এই ম্যাচে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করেন রোনালদো। পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকলেও ম্যাচে দৃশ্যমান কোনো প্রভাব রাখতে পারেননি তিনি। তিনটি শট নিলেও লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হন। সুযোগ তৈরি করা, ডিফেন্সে অবদান রাখা কিংবা বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানেও ছিলেন দলের অন্যতম পিছিয়ে থাকা খেলোয়াড়।
যদিও রোনালদোর সমালোচনায় সরাসরি যোগ দেননি কোচ রবার্তো মার্টিনেজ। ম্যাচ শেষে তিনি বরং দলের সামগ্রিক আক্রমণভাগের ব্যর্থতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
মার্টিনেজ বলেন, আমরা শেষ তৃতীয়াংশে যথেষ্ট কার্যকর ছিলাম না। আমাদের স্ট্রাইকারকে প্রয়োজনীয় বল সরবরাহ করতে পারিনি। রোনালদোর মুভমেন্ট কাজে লাগানোর মতো পরিস্থিতিও তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি।
তবুও পরিসংখ্যান বলছে, বড় টুর্নামেন্টে রোনালদোর গোলখরা দীর্ঘ হচ্ছে। ২০২২ বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করার পর বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১০ ম্যাচে গোল করতে পারেননি তিনি। ওপেন প্লে থেকে বড় আন্তর্জাতিক আসরে তার শেষ গোল এসেছে প্রায় পাঁচ বছর আগে।
ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে পর্তুগালের কৌশল নিয়ে। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, ভিটিনিয়া, রাফায়েল লেয়াও ও পেদ্রো নেতোর মতো প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে গড়া বর্তমান দলটিকে অনেকেই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী পর্তুগাল স্কোয়াড হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু সেই দলও আক্রমণে যেন এখনও রোনালদোকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই মূল দ্বন্দ্ব। পর্তুগাল কি নিজেদের সেরা ফুটবল খেলছে, নাকি এখনো ‘রোনালদোর ফুটবল’ খেলছে? কারণ বয়সের সঙ্গে রোনালদোর গতি, প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষকে একা হারিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে। অথচ দলের আক্রমণ পরিকল্পনার বড় অংশ এখনও তার উপস্থিতিকে ঘিরেই সাজানো হচ্ছে।
অবশ্য রোনালদোর অবদান নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। তিনি পর্তুগালের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, ইউরো চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে অতীতের অর্জনের চেয়ে বর্তমান পারফরম্যান্সই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর তাই প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়েছে—পর্তুগালের বিশ্বকাপ যাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা কি প্রতিপক্ষ, নাকি নিজেদের কৌশলগত রোনালদো-নির্ভরতা? সেই উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন কতদূর গড়াবে।







