জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে হেনস্তা, মারধর ও অপহরণচেষ্টার অভিযোগের পাঁচ দিন পার হলেও এখনো মামলা হয়নি। একই সঙ্গে অভিযোগে নাম থাকা পুলিশ সদস্যদের কাউকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে ঘটনার পর অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তৎকালীন ওসি আরিফুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে অভিযোগে নাম থাকা পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত সোহেল হোসেন সরকারকে পৃথক একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
গত শনিবার জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ভাই সাব্বির আলম খুলশী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী এবং পুলিশের সোর্স সোহেল হোসেন সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়।
আদালতের জিআরও শাখা ও হাজতখানার তথ্য অনুযায়ী, সোহেল হোসেন সরকারকে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গত শনিবার ওই মামলায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দামপাড়া পুলিশ লাইনসে হামলা এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনায় পুলিশের করা একটি মামলায় সোহেলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ওই মামলায় ১০ থেকে ১৫ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছিল।
অভিযোগের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী সাব্বির আলম। তিনি কালবেলাকে বলেন, শনিবার অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের নাম থাকায় তদন্ত শেষে মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার চোরাচালান সংক্রান্ত তথ্যটি গোয়েন্দা সূত্রের হওয়ায় তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্তাধীন বলে জানতে পারছি। আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কারও সঙ্গে এমন ঘটনা না ঘটে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার (১২ জুন) রাতে, যখন জাতীয় ক্রিকেটার নাঈম হাসান ঢাকা থেকে একটি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচ খেলে চট্টগ্রামে ফেরেন। বিমানবন্দরে নামার পর তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নিজ বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, পথে নগরের লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের নির্দেশে একটি চেকপোস্ট বসানো হয়। সেই চেকপোস্টে সোনা চোরাচালানের সন্দেহে একটি সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নাঈম হাসানের অটোরিকশা থামানো হয়।
অভিযোগে বলা হয়, গাড়ি থামানোর পরই তাকে ডিবি পরিচয়ে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। এ সময় নাঈম হাসান নিজের জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় দিলেও তা উপেক্ষা করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী এবং পুলিশের সোর্স সোহেল হোসেন সরকার তাকে রাস্তায় প্রকাশ্যে মারধর করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন তাকে চিনে ফেললেও তাকে জোর করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার সময় ওসির নির্দেশে পুরো অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ থাকলেও অভিযুক্ত ওসি আরিফুর রহমান বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, তিনি ওই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন এবং কোনো অভিযান পরিচালনার নির্দেশও দেননি। তবে নাঈমের পরিবার ও অভিযোগকারীর দাবি, পুরো ঘটনাটি তার নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে।
থানায় নেওয়ার পর নাঈম হাসানকে দীর্ঘ সময় ধরে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে বিসিবির হস্তক্ষেপ এবং পুলিশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের পর রাতেই তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ার পর পুলিশ সোর্স সোহেল হোসেন সরকারকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। তবে অভিযোগে নাম থাকা পুলিশ সদস্য এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেল চৌধুরীকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। শুধু তাদের খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয় এবং পরে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
অন্যদিকে ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমানকে পরবর্তীতে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই এবং অভিযানের বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না।
এদিকে ঘটনাটিকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে যে, শুধু সাময়িক বরখাস্ত ও প্রত্যাহারের মধ্যেই বিষয়টি সীমিত রেখে ঘটনাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না। এ বিষয়ে অনেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের মতে,অভিযোগ নিয়ে মামলা রুজু হলেও এখনো মামলা না হওয়ার বিষয়টি অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়,যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই সিএমপি কমিশনার ঘটনাটিকে ‘চরম অপেশাদার আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপপুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) আলমগীর হোসেন।
তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, বিষয়টি বিভাগীয় ও আইনগত উভয় প্রক্রিয়ায় তদন্তাধীন রয়েছে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনার পর আইনজীবী মহলেও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা দেখা দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসাদুজ্জামান মন্তব্য করেন, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে একই আইন প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তিনি বলেন, গুরুতর অভিযোগ থাকলে দ্রুত গ্রেপ্তার ও তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, নইলে আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
ঘটনার চার দিন পর মঙ্গলবার জাতীয় ক্রিকেটার নাঈম হাসান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, তিনি বর্তমানে নিরাপদে আছেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। ঘটনার পর যারা তাকে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ভক্ত, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান এবং দোয়া কামনা করেন।
পাঁচ দিন পার হলেও অভিযোগটি এখনো মামলা হিসেবে রুজু না হওয়া এবং অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







