* অছাত্রদের সমিতির কমিটিতে পদ দেয়ার দাবি
* ছাত্রনেতাদের উপস্থিতিতে হামলা
* নিষ্ক্রিয় ছিল প্রক্টর ও প্রশাসন
* সিসিটিভি বন্ধ করে হামলা
* হামলার নেপথ্যে ২য় ক্যাম্পাসের টেন্ডার
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) সাংবাদিক সমিতির নির্বাচন ও নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে হামলা ও দখলের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনা ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলছেন। সাংবাদিক সমিতির দখল ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ ঘটনার সূত্রপাত দাবি উভয় পক্ষের।
সূত্রে জানা যায়, সাংবাদিক সমিতির নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে গত ২৬ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সদস্য আহ্বান করা হয়। নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ৩ ফেব্রুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. আন্ওয়ারুস সালাম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির দপ্তর সম্পাদক ও দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার মো. রাশিম মোল্লাকে নিয়ে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।
পরবর্তীতে সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গত ২ মার্চ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এরই অংশ হিসেবে গতকাল মনোনয়নপত্র উত্তোলন ও জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত ছিল। নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে গত কয়েকদিন ধরেই নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছিল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। কিন্তু কমিশন সব চাপ উপেক্ষা করে সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিলে গতকাল দুপুরে ছাত্রদলের শতাধিক নেতাকর্মী সমিতির কার্যালয়ে এসে অবস্থানরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়।
অছাত্রদের সমিতির কমিটিতে পদ দেয়ার দাবি : সাংবাদিক সমিতির নির্বাচনে মাস্টার্সের ফলাফল ঘোষণা হওয়া অছাত্র শাহাদাত হোসেন অনু, মাহির মিলনকে এই কমিটিতে আনার জন্য নির্বাচন কমিশনকে চাপ দিতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিকভাবে নেতাকাথে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও এ চাপ প্রয়োগ করে। তবে বরাবরই নির্বাচন কমিশন যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে নির্বাচনী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল।
ছাত্রনেতাদের উপস্থিতিতে হামলা:
অবকাশ ভবনের তৃতীয় তলায় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে হামলার সময় নিচে দাঁড়িয়ে থেকে উস্কানি দিতে থাকে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এসময় অবকাশ ভবনের নিচে শাখার ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল, সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন, যুগ্ম-আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান রুমি, সুমন সরদার, জাফর আহমেদ, পরাগসহ অন্যান্য আহ্বায়ক সদস্যরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিচে নামার সময় জাতীয়তাবাদী হিন্দু ফোরামের সদস্য সচিব এবং পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের জয় সাহা বাংলাদেশের খবরের সাংবাদিক জান্নাতুন নাইমকে আঘাত করে। এছাড়া হামলার ঘটনায় কালের কণ্ঠের মো. জুনায়েত শেখ, যুগান্তরের সাকেরুল ইসলামসহ ১০ জনের অধিক সাংবাদিক আহত হন।
নিষ্ক্রিয় ছিল প্রক্টর ও প্রশাসন :
নির্বাচন আয়োজনেন বিষয়ে কমিশনকে সব ধরণের নিরাপত্তা সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় প্রক্টর। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি রইস উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক ইমরান হুসাইনও সম্মতি জ্ঞাপন করে। কিন্তু সমিতির কার্যালয়ে হামলার পরও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে প্রক্টরসহ পুরো প্রশাসন। হামলার দিনও তাকে কয়েক দফা ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি অভিযোগ সাংবাদিকদের। একপর্যায়ে সংঘর্ষের দীর্ঘ ২-৩ ঘণ্টা পর প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টররা এসে সমিতির কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেন। এরপর সবাইকে নিচে নেমে যেতে বলেন।
সিসিটিভি বন্ধ করে হামলা:
এদিকে গতকাল দুপুরে হামলা শুরুর আগে শুধুমাত্র উপাচার্য দপ্তরের সিসিটিভির ফুটেজ ব্যতীত ক্যম্পাসের সকল সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের একাধিক সূত্র জানায়, হামলা শুরুর আগে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন ও যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন সরদার আইটি দপ্তরে গিয়ে আইটি পরিচালকের সহায়তায় ক্যম্পাসের সকল সিসিটিভি বন্ধ করে দেয়। এটা বন্ধ করার জন্য ছাত্রদলের সুপার ফাইভ সহ সকলে অবকাশ ভবনের নিচে অবস্থান নিয়ে শতাধিক নেতাকর্মীকে উপরে পাঠায় এবং হামলা করে।
হামলার নেপথ্যে ২য় ক্যাম্পাসের টেন্ডার:
এদিকে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে হামলার নেপথ্যে কাজ করেছে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কার্যক্রম সেনাবাহিনীকে দেয়ার বিষয়ে সাংবাদিক সমিতি অনড় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব আগে থেকে ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তরের বিরোধী। স্বয়ং জবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব এক টেলিভিশন টকশোতে প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের বিরোধীতা করেছেন।
এ বিষয়ে সমিতির সদস্য জান্নাতুন নাইম বলেন, যা হয়েছে তার কোনোকিছু ব্যাখ্যা করতে চাই না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে সবাই বের হচ্ছিলাম। প্রক্টরসহ ছাত্রদলের হিমেল, আরেফিন, রুমি, সুমন সরদার ও জাফর সবাই নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। যখন গেট থেকে বের হয়েছি, তারপর সকলের সামনে আমাকে পেছন থেকে মাথায় আঘাত করলে আমি পড়ে যাই। সকলের সামনে জয় আমাকে মেরে চলে গেল, কেউ কিছু বললো না। এরপর আমার ক্যাম্পাসে যাওয়া নিয়েও আমি শংকিত।
এ বিষয়ে সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহতাব লিমন বলেন, সমিতিতে হামলার পর আমি উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে স্কিনে ক্যাম্পাসের সকল সিসিটিভির ফুটেজ বন্ধ দেখতে পাই। উপাচার্যকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোন সদূত্তর দিতে পারেন নি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সমিতিতে হামলার কিছুক্ষণ পূর্বেই ক্যম্পাসের সকল সিসিটিভি বন্ধ করা হয়েছে। এর অর্থ কি সমিতিতে এ হামলার সঙ্গে প্রশাসনেরও কেউ কেউ জড়িত ছিলো?
এ বিষয়ে আইটি পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে আইটির টেকনিশিয়ান সৈকত বলেন আমি শুনেছি ফাইবার তার কেটে যাওয়ায় সকল সিসিটিভির সংযোগ লাইন কেটে যায়। আরেক টেকনিশিয়ান শামিম বলেন, হঠাৎ করে দুপুর একটার কিছুক্ষণ পরে ক্যম্পাসের সকল সিসিটিভি বন্ধ হয়ে যায়। পরে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্রাউন্ডে সিসিটিভি মূল ফাইভার কেটে দেওয়া হয়েছে৷ এখন তা ঠিক করার চেষ্টা করছি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমি তাৎক্ষণিক আইটি পরিচালককে বলেছি। তিনি জানিয়েছেন টেকনিক্যাল সমস্যা হয়েছে।
হামলার বিষয়ে সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহতাব হোসেন লিমন বলেন, হামলার দিন প্রক্টর স্যারকে একাধিকবার ফোনকল করে আমরা সাড়া পাইনি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও নিরব ছিল। হামলার পরবর্তীতে তিনি আসেন।







