পর্তুগালের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপাঞ্চল মাদেইরার ফুনশাল শহরে ৪১ বছর আগে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছিল ছোট্ট এক শিশু। কে জানত, ফুটবলের প্রতি অদম্য ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম আর নিজের স্বপ্নের প্রতি অবিচল বিশ্বাসে একদিন তিনিই হয়ে উঠবেন প্রজন্মের আইকন, রেকর্ডের বরপুত্র! দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে জায়গা করে নেবেন বিশ্বের অন্যতম ধনী ও সফল ক্রীড়াবিদদের কাতারে।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্বকে যিনি আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন, যাকে ঘিরে সমর্থকেরা ভাগ হয়েছেন দুই শিবিরে, সেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম আজ ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গোলের পর গোল, রেকর্ডের পর রেকর্ড, অসংখ্য শিরোপা আর ব্যক্তিগত অর্জনে সাজানো তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। তাকে শুধু কয়েকটি বিশেষণে সংজ্ঞায়িত করা যায় না; তার উত্থান, সংগ্রাম, সাফল্য আর প্রভাব নিয়ে লেখা যেতে পারে আস্ত এক মহাকাব্য।
তবে সময়ের নিয়মে থামতে হচ্ছে একটি অধ্যায়। পর্তুগালের জার্সিতে আর দেখা যাবে না এই মহাতারকাকে। দেশের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল, ইউরো ও নেশনস লিগের শিরোপা; সবকিছু পেছনে রেখে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন রোনালদো। তাতে শেষ হচ্ছে জাতীয় দলের হয়ে তার দীর্ঘ পথচলা।
এক নজরে রোনালদোর আন্তর্জাতিক অধ্যায়
২০০৩ সালে কাজাখস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের হয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় রোনালদোর। এরপর ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। ২০০৪ সালের ইউরোতে ফাইনালে উঠলেও শিরোপা জেতা হয়নি। ঘরের মাঠে গ্রিসের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল পর্তুগালের। তবে সেই আসরেই নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তরুণ রোনালদো।
ইউরো জয়, অধিনায়ক হিসেবে ইতিহাস
রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। তবে ডাগআউটের পাশে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করেছেন, পালন করেছেন অনেকটা কোচের ভূমিকাও। শেষ পর্যন্ত স্বাগতিক ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোর শিরোপা জেতে পর্তুগাল।
২০২০ সালের ইউরোতে ৫ গোল করে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন রোনালদো। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৪ গোল নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে তার নেতৃত্বে ২০১৯ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও জেতে পর্তুগাল।
গোলের পর গোল, রেকর্ডের পর রেকর্ড
আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর সবচেয়ে বড় কীর্তিগুলোর একটি পুরুষ ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। ২০২১ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ইরানের আলি দাইয়ের ১০৯ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান তিনি। এরপর সেই সংখ্যাকে নিয়ে গেছেন ১৪৬-এ। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ২৩৪ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটিও তার দখলে।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করে টানা পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েন রোনালদো। তবে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতা হয়নি তার। পর্তুগালের হয়ে ২০০৬ সালে সেমিফাইনালে ওঠাই বিশ্বকাপে তার সেরা সাফল্য।
ক্লাব ফুটবলেও সাফল্যের শিখরে
জাতীয় দলের বাইরেও ক্লাব ফুটবলে রোনালদোর অর্জনের ঝুলি সমৃদ্ধ। স্পোর্টিং লিসবন থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিয়ে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইউনাইটেডের হয়ে জেতেন তিনটি প্রিমিয়ার লিগ ও একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অরও ওঠে তার হাতে।
এরপর রিয়াল মাদ্রিদে কাটিয়েছেন ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময়। স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে ৪৫০ গোল করে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। জেতেন চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ একাধিক শিরোপা। জুভেন্টাসের হয়েও সিরি ‘আ’ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। সব মিলিয়ে পাঁচবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা প্রথম খেলোয়াড় তিনি।
২০২৪ সালে পর্তুগালের হয়ে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করে পেশাদার ফুটবলে ৯০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন রোনালদো। এখন তার গোলসংখ্যা ৯৮৫। ক্যারিয়ারের শেষ বড় লক্ষ্য ১ হাজার গোলের মাইলফলক ছোঁয়া। সে লক্ষ্যে আপাতত সৌদি ক্লাব আল নাসরের হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন ৪১ বছর বয়সী এই তারকা।







