ঢাকার ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি হকারদের জীবিকা নিশ্চিত করতে ওয়ার্ডভিত্তিক হকার ব্যবস্থাপনা মডেল চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর মতে, শুধু হকার উচ্ছেদ করে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে জড়িত চাঁদাবাজির অর্থনীতি বন্ধ এবং হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এ প্রস্তাবের কথা জানান।
তিনি বলেন, ঢাকার ফুটপাত ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল চাঁদাবাজির অর্থনীতি। ২০১৬ সালে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় ঢাকায় ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা অনুমান করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে হকার্স ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, এ পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।
পাটোয়ারী বলেন, ফুটপাতের মালিক রাষ্ট্র, সেখানে ব্যবসা করেন হকাররা, অথচ ভাড়া আদায় করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও চাঁদাবাজ চক্র। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদা আদায়ের নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর পরিবর্তন হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
পাটওয়ারী তাঁর বক্তব্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের চাঁদাবাজ ও দখলদারদের তালিকা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, অপরাধের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত ২৭৮ জনের মধ্যে ২৩০ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের বর্তমান বা সাবেক নেতাকর্মী।
তবে এ ধরনের তালিকার তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী চক্রকে নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু হকার উচ্ছেদ করা হলে কিছুদিন পর আবার ফুটপাত দখল হবে। তখন আগের চেয়ে বেশি টাকা আদায়ের মাধ্যমে একই ব্যবসা চালু হতে পারে। ফলে উচ্ছেদ, পুনর্দখল ও চাঁদা আদায়ের চক্র অব্যাহত থাকবে।
হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় হকার ও তাঁদের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
বিকল্প কর্মসংস্থান কিংবা ব্যবসার উপযুক্ত জায়গা নিশ্চিত না করে তাঁদের উচ্ছেদ করলে তাঁরা আবারও ফুটপাতে ফিরে আসতে বাধ্য হবেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ডিজিটাল কার্ড ও নির্ধারিত বিক্রয় এলাকার উদ্যোগ থাকলেও কতজন হকার নিবন্ধিত হয়েছেন, কতজন বাস্তবে ব্যবসার জায়গা পেয়েছেন এবং সরকারি কোষাগারে কত টাকা জমা হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সমাধান হিসেবে তিনি ওয়ার্ডভিত্তিক হকার ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডে হকারদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এসব কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
কমিটির মাধ্যমে কোন এলাকায় কতজন হকার ব্যবসা করতে পারবেন, কোন সময়ে বসতে পারবেন এবং কী পরিমাণ ফি দিতে হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে পথচারীদের চলাচল, ক্রেতার উপস্থিতি ও হকারদের আয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় রাখার কথা বলেন তিনি।
এ ছাড়া প্রতিটি বরাদ্দ প্রকাশ্য ডিজিটাল তালিকায় রাখার, সরকারি ফি সরাসরি নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে জমা নেওয়ার এবং প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে রসিদ দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। চাঁদাবাজির অভিযোগ জানানোর জন্য স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থাও চালুর কথা বলেন।
পাটওয়ারীর প্রস্তাব, প্রথমে ঢাকার কয়েকটি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে এই মডেল চালু করে ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে। এরপর কার্যকারিতা বিবেচনায় পুরো ঢাকায় তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিকল্প স্থানে হকারদের ব্যবসা চালু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ফুটপাত দখলমুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, যেখানে ক্রেতা নেই, সেখানে দোকান বরাদ্দ দেওয়া পুনর্বাসন নয়। আবার জীবিকার বিকল্প নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ করাও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। পথচারীদের চলাচলের অধিকার, হকারদের জীবিকা এবং সিটি করপোরেশনের বৈধ রাজস্ব—এই তিনটি বিষয়কে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
তাঁর মতে, শুধু ফুটপাত পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অর্থনীতিও বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের ঘটনা চলতেই থাকবে।







