দেশের অভ্যন্তরে নন-ইউরিয়া সার পরিবহণের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) আহ্বান করা দুটি দরপত্রে অংশ নিতে পারেনি কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। টেন্ডার জমা দেওয়ার নির্ধারিত স্থানে ভয় দেখিয়ে একজন উচ্চস্বরে বলেন, ‘তোরা এতদিন খাইছোস, আর হবে না। এখন আমরা খাব।’
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কৃষক দলের একটি প্রভাবশালী গ্রুপ আতঙ্ক ছড়িয়ে দরপত্র জমাদানে বাধা সৃষ্টি করে। দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বিএডিসির আশপাশে ও দপ্তরে তাদের কর্মী-সমর্থকরা ছিল মহড়ায়। এর ফলে ভয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই দরপত্র জমা দিতে আসেনি। দরপত্র জমাদানের শেষ দিন ছিল মঙ্গলবার।
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ১৬ সেপ্টেম্বর একাধিক জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ৪০ হাজার টন এমওপি সার দেশের অভ্যন্তরে পরিবহণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। একই দিনে আরও ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার পরিবহণের জন্য পৃথক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। উভয় ক্ষেত্রেই ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিকল্পিতভাবে সার পরিবহণ খাতে নিয়মিত দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারদের মধ্যে আগে থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়। টেন্ডার জমা দেওয়ার নির্ধারিত স্থানে ভয় দেখিয়ে একজন উচ্চস্বরে বলেন, ‘তোরা এতদিন খাইছোস, আর হবে না। এখন আমরা খাব।’ ওই সময় সেখানে এমন ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যাতে কেউ টেন্ডারে অংশ নিতে সাহস না পায়। এ কারণেই কোনো পরিবহণ ঠিকাদার নিরাপত্তাহীনতার কথা চিন্তা করে সেখানে যেতে চাননি। তবে যারা ভয় দেখিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকেও কেউ দরপত্রে অংশ নেয়নি। মূলত উদ্দেশ্য হলো, তাদের সঙ্গে আপসরফা করেই টেন্ডার জমা দিতে হবে। এজন্য তারা এভাবে দরপত্র প্রক্রিয়া ঠেকিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করেছে।
এদিকে কৃষক দলের একজন প্রভাবশালী নেতা এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছে। ওই নেতার প্রভাব-দাপট এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে ইতোমধ্যেই এই সেক্টরের সবাই চরম বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। যিনি ঢাকার বাইরে নির্ধারিত দপ্তরে সময় না দিয়ে তদবির বাণিজ্য চালাতে সব সময় রাজধানীতে পড়ে থাকেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিবহণ ঠিকাদার যুগান্তরকে জানান, দরপত্র জমা দেওয়ার আগে বিএডিসির ভেতরের কয়েকজনের কাছ থেকে তারা সতর্কবার্তা পান। তাকে জানানো হয়, ওইদিন বিএডিসিতে গেলে ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ হিসাবে বলা হয়, দরপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়ার জন্য কিছু লোক সেখানে আসবে। এমন সতর্ক বার্তা পাওয়ার পর ঝুঁকি এড়াতে তিনি নিজে এবং তার মতো আরও কয়েকজন ঠিকাদার দরপত্র জমা দিতে যাননি।
ওই ঠিকাদার জানান, তার দীর্ঘদিনের টেন্ডারসংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতায় এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি আগে কখনো হতে হয়নি। তবে কারা সেখানে আসতে পারে বা কারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিএডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
বিএডিসি সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ না নেওয়ায় স্থানীয়ভাবে সার পরিবহণের জন্য পুনঃটেন্ডার আহ্বান করতে হবে। কারণ, নতুন করে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সময়মতো ঠিকাদার নিয়োগ করা না গেলে আসন্ন বোরো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার সরবরাহে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে সার পরিবহণ নিশ্চিত করা না গেলে এর প্রভাব কৃষক পর্যায়েও পড়তে পারে। বিশেষ করে চাহিদার সময়ে সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিভিন্ন অঞ্চলে সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে বুধবার বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ব্যবস্থাপক (পরিবহণ) মোহাম্মদ খসরু নোমানকে মোবাইল ফোনে কল করা হলে জানান, তিনি মিটিংয়ে আছেন। পরে কথা বলবেন। তবে পরে একাধিকবার কল করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি উল্লেখ করে এসএমএস-এর মাধ্যমে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
একই বিষয়ে বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. আজিম উদ্দিনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় বিএনপির অঙ্গসংগঠন কৃষক দলের কেউ জড়িত আছে কিনা- জানতে চাইলে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাকে বিএডিসি অফিসাররা একটা সংবাদের লিঙ্ক দিয়ে বলেছে যে, ওখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তখন ওনাদের বলেছি, আমাদের দলের কেউ থাকলে একটু তথ্য দাও; ব্যবস্থা নেব। তবে তারা সেভাবে নির্দিষ্ট করে কারও নামই বলতে পারল না। পরে জড়িতদের নাম জানার জন্য সারা দিন সময় দিলাম। কিন্তু জানতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ছেলেদের তো কোনোসময়ই টেন্ডারবাজির রেকর্ড নেই। সারা দেশেই আমাদের ছেলেরা কোথাও টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত রয়েছে, এটা কেউ বলতে পারবেন না। তবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কিছু হলে সেটি আলাদা কথা। তারপরও আমরা খোঁজ নিচ্ছি। এ ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’







