বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর উদ্যোগে পবিত্র সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টার, জিইসি মোড়ে এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। প্রধান ওয়ায়েজ হিসেবে আলোচনা পেশ করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মদীনাতুল উলূম কামিল মাদরাসা, ঢাকার মুহাদ্দিস ড. মুফতি আবুল কালাম আজাদ বাশার।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী এমপি। বিশেষ ওয়ায়েজ হিসেবে আলোচনা করেন বাইতুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রামের সাবেক অধ্যক্ষ ড. মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আবু নোমান এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রফেসর ড. বি.এম. মফিজুর রহমান আজহারী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শুধু রবিউল আউয়াল মাসের মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; সারা বছর তাঁর আদর্শের আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। রাসুল (সা.)-এর আগমনের উদ্দেশ্য আমাদের অনুধাবন করতে হবে। তাঁর আদর্শ অনুসরণের মধ্যেই সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ নিহিত। জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রিয় নবী (সা.)-কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি লাভ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানসহ রাসুল (সা.)-কে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। এই জীবনবিধান অনুসরণ করতে পারলে বিশ্বব্যবস্থায় কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে। যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসুলদের জীবনবিধান দিয়ে পাঠিয়েছেন। এই জীবনবিধান পরিপূর্ণ। রাসুল (সা.)-এর আদর্শে বিশ্বাসীরা ক্ষমতা বা গদির জন্য রাজনীতি করে না; তারা ইসলামী জীবনবিধান রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতি করে।
তিনি আরও বলেন, রাসুল (সা.) শুধু ইবাদত-বন্দেগির শিক্ষা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি; তিনি মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের জন্যও আদর্শ রেখে গেছেন। মদিনায় তিনি এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজকের পৃথিবীতে অশান্তি, বৈষম্য ও অবিচার দূর করতে হলে সেই আদর্শ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, চট্টগ্রাম দিয়েই ইসলামের প্রবেশ ঘটেছিল। এই চট্টগ্রামেই ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। আগামী বাংলাদেশ হবে রাসুল (সা.)-এর আদর্শভিত্তিক বাংলাদেশ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, রাসুল (সা.) ছিলেন নেতাদের মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী নেতা। পৃথিবীর অন্য কোনো নেতার সঙ্গে তাঁর তুলনা হতে পারে না। তাঁর জীবনে ছিল সর্বোত্তম আদর্শ। তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ মানুষদের নিয়ে তিনি ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সমাজ থেকে অনাচার, দুরাচার, স্বৈরাচার ও ওয়াদাখেলাফকারীদের থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে রাসুল (সা.)-এর আদর্শের কোনো বিকল্প নেই। তাঁর নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব ও সফলতা এমন ছিল যে, প্রায় দেড় হাজার বছর পরও তা বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে আছে। আমরা কোনোভাবেই আর কোনো স্বৈরাচার বরদাশত করব না।
বিশেষ অতিথি আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী এমপি বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেক মুসলমান রাসুল (সা.)-এর আদর্শকে ভালোবাসেন। বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে রাসুল (সা.) প্রদর্শিত যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন। ইসলামে সম্পত্তি বণ্টনের সুস্পষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও সরকার কেন এই আইনে হস্তক্ষেপ করেছে, তা জনগণের কাছে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য কল্যাণ নিশ্চিত হবে।
আলোচনায় প্রফেসর ড. বি.এম. মফিজুর রহমান আজহারী বলেন, রাসুল (সা.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ন্যায়নিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার। তিনি বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শূরা বা যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। চুক্তির মর্যাদা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, সংঘাত ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তাঁর দৃষ্টান্ত আজও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমা, পুনর্মিলন ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিনি সংঘাত-পরবর্তী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের চলমান মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। তাঁর জীবনাদর্শে ন্যায়বিচার, মানুষের সমমর্যাদা ও অধিকার, সম্পদের সুষম বণ্টন, শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক সংহতির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত তাঁর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সূরা আল-আরাফের ১৫৮ নম্বর আয়াতের ঘোষণার আলোকে বিশ্বনবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওয়াহ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বমানবতার মুক্তির পথ সুগম করতে হবে।
মাহফিলে আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন, নেজামে ইসলাম পার্টি চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি মাওলানা জিয়াউল হোসাইন, চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বাশার, মুহাম্মদ উল্লাহ, ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুস, মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. এ কে এম ফজলুল হক।
মাহফিলে চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনায় ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।







