ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ-এ জোরপূর্বকভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল চট্টগ্রামের শিল্পপতি মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ চৌধুরীর (এস. আলম) এস আলম গ্রুপ। এ ব্যাংকে তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকাকালে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব প্রকাশিত এসব খবরের ফটোকার্ড ফেসবুকে শেয়ার করে ব্যাংকটিতে নিয়োগে অনিয়মের দায় চাপিয়ে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে। তার দাবি, ইসলামী ব্যাংক জামায়াত নিয়ন্ত্রিত। সেখানে নূন্যতম কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই এবং সেখানে একমাত্র যোগ্যতা শিবিরের রাজনীতি করা।
আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিজ টাইমলাইনে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়া ৮৫৪২ নিয়োগ’ শীর্ষক সমকালে এবং ‘পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে চাকরি পান সাড়ে ৮ হাজার কর্মী, নিয়োগে আরও যত অনিয়ম করা হয়’ শীর্ষক প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদের দুটি ফটোকার্ড শেয়ার করেন। যেগুলোতে এস আলমের হস্তক্ষেপে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটিতে অবৈধভাবে নিয়োগের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
দুপুর ১ টা ৪৯ মিনিটে দেওয়া ওই ফেসবুক পোস্টটির ক্যাপশনে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম এস আলমের কোনো প্রসঙ্গ না টেনে লেখেন, “ইসলামের লেবাসধারীদের সবকিছু হালাল। অথচ জামায়াত নিয়ন্ত্রিত সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে নূন্যতম কোন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নেই। সেখানে একমাত্র যোগ্যতা হল শিবিরের রাজনীতি করা। শুধু তাই নয়, সরকারি বেসরকারি সকল প্রকার নিয়োগে ভাইভা বোর্ডে জামায়াতে ইসলামীর কেও থাকলে, শিবিরের নেতা-কর্মীদের কত মার্কস দেয়া হয়, সেটা ওপেন সিক্রেট। কিন্তু দিবালোকের মতো সত্য বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে ইসলামি ছাত্রশিবির যুগের পর যুগ অপরাপর সংগঠনকে দায়ী করে প্রপাগাণ্ডা, মিথ্যাচারে লিপ্ত।”
এরপর, ২ টা ১০ মিনিটে পোস্টটি আবার এডিট (সম্পাদনা) করেন তিনি। আগের পোস্টে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে এস আলমের কোনো সমালোচনা না করলেও পরে দেওয়া এ পোস্টে এস আলমের সময়ে নিয়োগ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে স্বীকার করেন ছাত্রদল সভাপতি।
পরে সম্পাদিত পোস্টে রাকিব লেখেন, “ইসলামের লেবাসধারীদের সবকিছু হালাল। অথচ জামায়াত নিয়ন্ত্রিত সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে নূন্যতম কোন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নেই। সেখানে একমাত্র যোগ্যতা হল শিবিরের রাজনীতি করা। শুধু তাই নয়, সরকারি বেসরকারি সকল প্রকার নিয়োগে ভাইভা বোর্ডে জামায়াতে ইসলামীর কেও থাকলে, শিবিরের নেতা-কর্মীদের কত মার্কস দেয়া হয়, সেটা ওপেন সিক্রেট। কিন্তু দিবালোকের মতো সত্য বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে ইসলামি ছাত্র শিবির যুগের পর যুগ অপরাপর সংগঠনকে দায়ী করে প্রপাগাণ্ডা, মিথ্যাচারে লিপ্ত।”
এতে তিনি আরও লেখেন, “এস আলমের মালিকানাধীন সময়ে নিয়োগকৃতদের বিষয়ে অবশ্যই যথাযথ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়নি, এটি যেমন সত্য, ঠিক একইভাবে এই ৮ হাজারের অধিক শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও কখনোই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে না, এটাও সুনিশ্চিত। ইসলামি ব্যাংক দেউলিয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংক জনগণের টাকায় সাপোর্ট দিবে কিন্তু নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করা হয় শুধুমাত্র শিবিরের নেতা-কর্মীদের। এভাবেই ইসলামি ব্যাংকের অলিখিত তথাকথিত স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে।”
তাছাড়াও, সম্পাদিত ওই পোস্টটিতে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ইসলামী ব্যাংকে এক কর্মী পদের নিয়োগে মাসুদ হোসাইন নামে এক ব্যক্তির জন্য ঝালকাঠির জামায়াত নেতা শেখ নেয়ামুল করিম সুপারিশ করেছেন এমন একটি পত্রের ছবি সংযুক্ত করেন; যেটির তারিখ ছিল ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর। অন্যদিকে, তার শেয়ার করা সংবাদগুলোর ফটোকার্ডে তথ্য ছিল ২০১৭ সাল থেকে চব্বিশের আগস্ট পর্যন্ত অর্থাৎ এস আলমের মেয়াদকালীন সময়ের।
প্রসঙ্গত, ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণ থাকাকালে ব্যাংকটিতে ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ হয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়া কেবল জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি জমা নিয়ে আট হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই এস আলমের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া এবং তার গ্রুপের আসাদগঞ্জ অফিসে রাখা বাক্সে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ এবং আগস্টে সরকার পতনের পর ছাঁটাই প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কিনা, তা যাচাইয়ের জন্য চলতি বছরের এপ্রিলে গঠিত কমিটি এই প্রতিবেদন দেয়।
বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। সাধারণত বিভিন্ন ব্যাংকে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয় যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে।
মূল্যায়ন পরীক্ষার পর ছাঁটাই হওয়া কর্মী এবং ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিদর্শন প্রতিবেদনে কোনো সুপারিশ না করে শুধু ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, “কর্মী নিয়োগ এবং ছাঁটাই– দুটিই ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল। তারাই ছাঁটাই করেছে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা সমীচীন হবে না।”
পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের মোট কর্মী ছিল ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জন। কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আট হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলার আট হাজার ৯৯ জন। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ছিল পাঁচ হাজার ১৪৮ জন।







