সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর পর রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগের বিরোধিতার কথা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষ যখন নানা ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে, তখন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বেতন বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নিলে আমরা এর বিরোধিতা করব।’
আজ বুধবার মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াত বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো আসার পর মন্ত্রী-এমপিদের বেতন বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। কিন্তু তারা বেতন বাড়ানোর জন্য সংসদে যাননি। দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন হলে সেদিন বেতন বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তি জানাব না। কিন্তু সমাজের বড় একটি অংশ যখন সংকটের মধ্যে রয়েছে, তখন জনপ্রতিনিধিদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হতে পারে না।’
এর আগে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্মানি ও ভাতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অতীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সাংবিধানিক পদধারীদের সম্মানি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এবারও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মতবিনিময়সভায় জামায়াত আমির জানান, তারা ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি নেওয়ার পক্ষেও নন। তিনি বলেন,‘আমরা বলেছি ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমরা নেব না। আমরা নিই না, সরকারি দলও নেয়নি। আমরা এটাকে স্বাগত জানিয়েছি।’
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে অস্বাভাবিকভাবে দেশ পরিচালনা করা হচ্ছে। দুটি শপথ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। সেখান থেকেই সংকটের শুরু হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। নির্বাচনের পর সবাই গণভোটের পক্ষে থাকলেও পরে সরকারি দল সেখান থেকে সরে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে তারা সংসদে নোটিশ দিলেও সব নোটিশ গ্রহণ করা হয় না। সীমান্ত সমস্যা, শিশু ধর্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে দফায় দফায় নোটিশ দেওয়ার পরও তা গ্রহণ না করার অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘তাদের যেটা খুশি তারা সেটা নেন। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে নোটিশ দিলে আমাদের বলা হলো আপনারা প্রত্যাহার করেন। আমরা বলেছি, কেন প্রত্যাহার করব? বিরোধী দলের অনেকটা হাত-পা বাঁধা।’
সাংবাদিকদের বেতন-বোনাসের বিষয়েও সংসদে কথা বলার পাশাপাশি বাইরে থেকেও কথা বলবেন বলে জানান তিনি। সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই চতুর্থ স্তম্ভ ঠিক থাকলে দেশ ঠিক থাকবে।’
কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, সরকার কর্মসংস্থান তৈরির কথা বললেও বাস্তবে মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে শুরু করেছে। সরকারের কাছে তাদের পরামর্শ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি তাদের পরামর্শ নেয়, তাহলে তারা সহযোগিতা করবেন। অন্যথায় জনগণের কাছে যাবেন। সংসদে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন না বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আশপাশের দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম—এমন যুক্তি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু ওইসব দেশের অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক নয়। তার দাবি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়ানোর পর সেটিকে সহনীয় মাত্রা বলা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সহনীয় না অসহনীয়—যে ভাই বাইকে রাইড শেয়ার করে সংসার চালান, তিনি জানেন ২০ টাকা তার জন্য কতটা সহনীয়।’
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা-রংপুর লংমার্চ নিয়েও কথা বলেন জামায়াত আমির। লংমার্চে জনগণের সাড়া পাওয়া যায়নি—এমন সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, সরকার যদি মনে করে লংমার্চে সাড়া পাওয়া যায়নি, তাহলে এ নিয়ে এত সমালোচনা কেন করা হচ্ছে। লংমার্চের কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়েছে—এমন সমালোচনারও জবাব দেন তিনি। তার প্রশ্ন, লংমার্চ না করলে সংশ্লিষ্টরা কি জ্বালানি খরচ করতেন না?
লংমার্চ ও বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ট্রেনে আগুন, বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জামায়াত ও এনসিপিকে দায়ী করার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এসব ঘটনা তাদের কর্মসূচি বানচাল করার জন্য অন্যরা করছে। জামায়াত পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে সব কর্মসূচি পালন করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মতবিনিময়সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
এ সময় জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মা’ছুম, হামিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), মোবারক হোসাইন, মতিউর রহমান আকন্দ, শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।







