জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর পর্ব মৌখিকভাবে না নিয়ে কেবল টেবিলে উপস্থাপিত করার সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। এর ফলে সংসদ সদস্যরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং মন্ত্রীদের জবাবদিহিতা এড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
রোববার (১৯ এপ্রিল) বিকেলে সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এই অভিযোগ তোলেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, মাননীয় স্পিকার, ফাংশনাল পার্লামেন্টের জন্য মন্ত্রীদের সরাসরি প্রশ্ন করা এবং তাদের কাছ থেকে উত্তর পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে দেখছি তারকা চিহ্নিত প্রশ্নগুলো শুধু টেবিলে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে যে উত্তর লিখে দেওয়া হয়, মন্ত্রীরা শুধু সেটাই আমাদের দিচ্ছেন। এতে আমাদের সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ থাকছে না। সংসদ কি তাহলে কেবল একটি স্ক্রিপ্টেড মনোলগ সেশনে পরিণত হবে?
তিনি আরও বলেন, আমাদের কথা বলার জায়গা খুবই সীমিত। মাত্র এক-দেড় মিনিট সময় পাই। সেই সময়ে আমরা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মন্ত্রীদের প্রশ্ন করি। কিন্তু এই প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় আমরা অধিকার বঞ্চিত হচ্ছি।
কার্টুন শেয়ার ও হাসান ইনামের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গ
বক্তব্যের এক পর্যায়ে সাম্প্রতিক সময়ে কার্টুন শেয়ার করার দায়ে হাসান ইনাম নামক এক ব্যক্তির গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তোলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।
তিনি বলেন, হাসিনা আমলেও কার্টুন শেয়ার বা কটূক্তির জন্য গ্রেপ্তার করা হতো। আমরা কল্পনাও করতে পারিনি এই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও এমনটা ঘটবে। মাননীয় চিফ হুইপ মহোদয় আমাদের ইনভাইট করেছিলেন এবং একটি রূপক বা স্যাটায়ার (তিমি ও হাঙর) ব্যবহার করেছিলেন। সেটা মিম শেয়ার করার কারণে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় মামলা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ২৫ ধারা মূলত যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োগের কথা, কিন্তু একটি মিম শেয়ার করার মধ্যে যৌন নির্যাতন কোথায়? বিরোধী মত দমনের জন্য এই আইন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং জামিনও দেওয়া হচ্ছে না।
হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যের জবাবে স্পিকার বলেন, কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী অধিকারের প্রশ্ন (কোশ্চেন অব প্রিভিলেজ) উত্থাপনের জন্য দুই ঘণ্টা আগে নোটিশ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তিনি এটি গুরুত্ব সহকারে দেখার আশ্বাস দেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, তার বা সরকারের সমালোচনা করে কার্টুন আঁকার কারণে যদি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তবে তাকে মুক্তি দেওয়া উচিত।
প্রশ্নোত্তর পর্ব নিয়ে বিরোধী দলীয় সদস্যের অভিযোগের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, বিরোধী দলীয় সদস্যের কথা আংশিক সঠিক। প্রশ্নোত্তর পর্ব সব সদস্যের অধিকার। তবে বিরোধী দলীয় নেতা প্রস্তাব করেছেন যেন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ১২ ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। ৩০ তারিখের মধ্যে সংসদ শেষ করতে হলে এবং এই দীর্ঘ আলোচনা শেষ করতে হলে আমাদের হাতে সময় কম। সে কারণেই প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে দেওয়া হচ্ছে। তবে সদস্যরা যদি রাত ১০টা পর্যন্ত সংসদ চালাতে একমত হন, তবে আমরা টেবিল করতে চাই না, আমরা জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী।
হাসান ইনাম নামের এক ব্যক্তির গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, আমি জানতাম এই বিষয়টি উঠতে পারে, তাই আমি ফাইল নিয়ে এসেছি। আমার এবং আমার দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য কুৎসা, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার কারণে আমি ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন থানায় জিডি করিয়েছি। আমি নির্বাচন কমিশনেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম যেন ফেক আইডি থেকে অপপ্রচার বন্ধ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, গতকাল পত্রিকায় দেখেছি এক ভদ্রলোককে কার্টুন আকার কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি এই সংসদে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, আমার কার্টুন আঁকার কারণে যদি কেউ গ্রেপ্তার হয়ে থাকে, তবে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি আপনার মাধ্যমে অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি নিজেও আজ ফেসবুকে এ নিয়ে পোস্ট দিয়েছি।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে চিফ হুইপ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তি কেবল কার্টুন নয়, অন্য কোনো সাইবার অপরাধ বা মানি লন্ডারিংয়ের মতো বিষয়ের সঙ্গে জড়িত কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। যদি তিনি কেবল রাজনৈতিক স্যাটায়ার বা কার্টুন এঁকে থাকেন, তবে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু যদি অন্য কোনো অপরাধের প্রমাণ থাকে, তবে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে বলে জানান তিনি।







