ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের ক্যান্টিনে নিয়মিত খাবার খেয়ে বিল পরিশোধ না করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে। ক্যান্টিনের মালিকের অভিযোগ, বিল পরিশোধের কথা বলায় তিনি ও তার সঙ্গে থাকা আরেকজন তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। পরে ঘটনার বিষয়ে কথা বলার জেরে তারা আবার ক্যান্টিনে এসে ম্যানেজারকে হুমকি-ধামকি দেন।
বিজয় একাত্তর হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য ও ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের সোলায়মান হোসাইন রবির অভিযোগ, ক্যান্টিন মালিককে চাপ দিয়ে মিথ্যা বক্তব্য দেওয়ানোর চেষ্টা চলছে এবং শিবির-সমর্থিত মাধ্যমে তাদের চরিত্রহননের অপচেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি এসব কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি জানান।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) হলের অভ্যন্তরীণ একটি ফেসবুক গ্রুপে অভিযোগটি সামনে আসে। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এবং ক্যান্টিন মালিকের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ছাত্রদল নেতাদের সংশ্লিষ্টতার কথা জানা যায়।
অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থী হলেন বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুস্তাফিজুর রহমান পলাশ ও আসিফ ইকবাল নিলয়।
ক্যান্টিন মালিক তাওহিদ মুন্সি জানান, কয়েক দিন আগে রাফি (ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের কার্যনির্বাহী সদস্য) নামের এক শিক্ষার্থী ও তার সঙ্গে থাকা অন্য একজন তাকে ডেকে কথা বলেন। এ সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ডাকছেন জানিয়ে আগে শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা বলেন, ক্যান্টিন চালাতে হলে তাদের কথা আগে শুনতে হবে, এভাবে ক্যান্টিন চালানো সম্ভব নয়।
তাওহিদের ভাষ্য, পরে তিনি শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে ফিরে এলে ওই দুজন তার পেছনে পেছনে ভেতরে এসে তার সঙ্গে বসেন। তখন তিনি তাদের জানান, খাবার খেয়ে বিল না দিয়ে চলে যাওয়াটা ভুলবশত হয়ে থাকতে পারে; এ কারণেই তিনি কর্মীদের দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন। এতে খারাপ ব্যবহারের কিছু হয়নি বলেও তিনি তাদের স্পষ্ট করেন।
তাওহিদ জানান, ওই সময় তারা নিজেদের সাবেক ছাত্রদল কমিটির সদস্য এবং ভবিষ্যৎ কমিটিতেও পদ পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানান। একই সঙ্গে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগ তোলেন। তখন তিনি জানান যে তাদের চিনতে পারেননি, তবে এখন চিনেছেন এবং ভবিষ্যতে আর সমস্যা হবে না।
ক্যান্টিন মালিকের অভিযোগ, এরপর থেকে ওই দুজন নিয়মিত খাবার খেলেও বিল পরিশোধ করছেন না। তারা কোনো টোকেন নেন না, ক্যাশেও জানান না এবং বিল দেন না। তাদের মধ্যে একজন কখনো কখনো বিল দিলেও অন্যজন ঘটনার পর থেকে কোনো টাকা দেননি বলে দাবি তার।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে তার এক কর্মী পরিচিত এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেখানে ছাত্রদলের কয়েকজন বিল না দিয়ে খাচ্ছেন বলে আলোচনা হওয়ার পর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই ওই ব্যক্তিরা ক্যান্টিনে এসে তার ম্যানেজারের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন।
ঘটনার সময় বাইরে ছিলেন জানিয়ে তাওহিদ বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তার ম্যানেজারকে ধমক দেন এবং খাবারের মেনু লেখার কাজ বন্ধ করে তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদল নেতা পলাশ বলেন, তিন-চার দিন আগে তাওহিদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে বলেছিলাম, ভাই, পকেটে তো সব সময় টাকা থাকে না। যখন টাকা থাকবে না, তখন লিখে রাখলে ভালো হয়। তখন তিনি বলেন, ভাই, আপনার লেখা লাগবে না। টাকা না থাকলে খেয়ে যাবেন, সমস্যা নেই। পরে টাকা হলে বিলটা দিয়ে যাবেন, শুধু সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
অন্যদিকে ডাকসু-২৫ এর বিজয় একাত্তর হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য ও ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের সোলায়মান হোসাইন রবির দাবি, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলকে নিয়ে শিবিরের কর্মীরা ‘চূড়ান্ত পর্যায়ের অপপ্রচার’ চালাচ্ছে। অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।
সোলায়মান হোসাইন বলেন, হলের হাউস টিউটরের কক্ষে হল সংসদের পরিচয় দিয়ে শিবিরের কর্মীরা ক্যান্টিন মালিককে আতঙ্কিত করে রেখেছিলেন। তিনি ও আহনাফ আহমেদ রাফি সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তখন ক্যান্টিন মালিক জানান, এ বিষয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই এবং টাকা না থাকলে শিক্ষার্থীদের সাময়িকভাবে বাকি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ম্যানেজার এ সমঝোতার বিষয়টি জানতেন না বলে ক্যান্টিন মালিক তাদের জানিয়েছেন।
সোলায়মানের অভিযোগ, তা সত্ত্বেও ক্যান্টিন মালিককে চাপ দিয়ে মিথ্যা বক্তব্য দেওয়ানোর চেষ্টা চলছে এবং শিবির-সমর্থিত মাধ্যমে তাদের চরিত্রহননের অপচেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি এসব কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি জানান।
হলের জিএস আশিক বিল্লাহ জানান, সকালে হলের একটি গ্রুপে মাসুম বিল্লাহ নামের এক শিক্ষার্থী পোস্ট দিয়ে অভিযোগ করেন যে ক্যান্টিনে ছাত্রদলের পরিচয়ে কয়েকজন খাবার খেয়ে বিল না দিয়েই চলে যাচ্ছেন। পোস্টে ছাত্রদলের সাজ্জাদ, মায়েদ ও সাকিব বিশ্বাসের নাম উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
আশিক বিল্লাহর ভাষ্য, পরে ছাত্রদলের এক কর্মী কাউসার জানান—সংশ্লিষ্ট এক শিক্ষার্থীর কাছে কয়েক দিন ধরে টাকা না থাকায় তিনি ক্যান্টিনে বাকি খাচ্ছেন। এর আগে তাকে একবার বিলের জন্য বলা হয়েছিল। পরে হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য আহনাফ আহমেদ রাফি, ক্যান্টিন মালিক ও সংশ্লিষ্ট দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে বিষয়টি সমঝোতা হয়। তবে ক্যান্টিনের ম্যানেজার এ সমঝোতার কথা জানতেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জিএস বলেন, ম্যানেজার বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এর মধ্যেই হল সংসদও বাকি খাওয়ার কথা জানতে পারে। তবে এভাবে বাকি খাওয়ার প্রবণতা শুরু হলে ক্যান্টিনের খাবারের মান আবারও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা প্রশাসনকে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রশাসনের কাছে আমরা উদ্বেগের কথা জানিয়েছি। কারণ, বাকি খাওয়ার সুযোগ দিলে ধীরে ধীরে তা ‘ফাও খাওয়ার’ সংস্কৃতিতে রূপ নিতে পারে। এতে ক্যান্টিন ব্যবস্থাপনা ও খাবারের মান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
‘ফাও খাওয়ার’ অভিযোগের বিষয়ে আশিক বিল্লাহ বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে তার মতে, কোনো শিক্ষার্থীকে নিয়মিত বিলের তাগাদা না দিয়ে খাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের সুযোগ কয়েকজন থেকে ধীরে ধীরে আরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।







