দুবাই থেকে কারামুক্তির পর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি ও বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। গত ১৭ আগস্ট তিনি দুবাই থেকে সেখানে যান। ওই দেশের পাসপোর্ট এবং দেশটিতে যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে তার। সেন্ট লুসিয়ার গ্রোস আইসলেট এলাকায় তার ফ্ল্যাটও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দুর্নীতিবাজ আইজিপি বেনজীর গত ২৭ জুলাই দুবাইয়ের আদালত থেকে জামিন পান এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই কারামুক্ত হন। এর আগে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত নথি ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিন দেয়। তার জামিনের জন্য ইউরোপের একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা দুবাইয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে জোর লবিং করেন। দুবাইয়ের আদালত থেকে তার জামিন ও কারামুক্তির খবরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হইচই পড়ে যায়। তাৎক্ষণিক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়; তবে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
সূত্র জানায়, জামিন পাওয়ার পরই দুবাই থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন বেনজীর। স্পেনসহ একাধিক দেশে যাওয়ার কথা চিন্তা করলেও বেশি সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ বিবেচনা করে শেষমেশ তিনি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়াকেই বেছে নেন।
বেনজীর ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া এক ডিআইজি আমার দেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বেনজীর তৃতীয় দেশে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সেন্ট লুসিয়ায় গেছেন বলে ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত শুরু হলে ২০২৪ সালের মে মাসে চুপিসারে দেশ ছাড়েন বেনজীর। বিদেশে যাওয়ার পর একাধিক দেশে তার অবস্থানের খবর পাওয়া যায়। পরে অনেকটা নাটকীয়ভাবে দুবাই পুলিশের হাতে বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবর বাংলাদেশ পুলিশের কাছে আসে ১২ জুন। দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) পুলিশ ইমেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখাকে বিষয়টি জানিয়েছিল। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে তার গ্রেপ্তারের তথ্য জানান। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও আরব আমিরাত থেকে বেনজীরকে ফেরত আনা সম্ভব হবে বলে সরকার আশা প্রকাশও করেছিল। তাকে দ্রুত ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়। কূটনীতিক চ্যানেলেও যোগাযোগ করে সরকার। দুবাই পুলিশ বেনজীরের নথিপত্র চেয়ে বাংলাদেশ পুলিশকে অনুরোধ করে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৪৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট পাঠায় দুবাই পুলিশের কাছে।
বাংলাদেশ সরকার আশা করেছিল বেনজীরকে ফেরত দেবে দুবাই। কিন্তু তাকে ফেরত দেওয়া তো দূরের কথা, ২৭ জুলাই আরব আমিরাতের একটি আদালত তার জামিন মঞ্জুর করে এবং তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) শাহদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সরবরাহ করা হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি বেনজীর দুবাই থেকে সেন্ট লুসিয়ায় গেছেন। আমরা বিষয়টির খোঁজ নিচ্ছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অপরাধবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সাবেক আইজিপি বেনজীরের জামিন এবং অন্য দেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি শোনা যাচ্ছে। এতে অবশ্যই তাকে আইন ও বিচারের মুখোমুখি করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমরা আগেই বলেছি, দুবাই থেকে তাকে ফেরত আনার বিষয়ে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা ছিল। কারণ, দুবাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই। তিনি আরো জানান, ‘বেনজীর প্রভাবশালী। ভেতরের পরিস্থিতিতে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আইনগতভাবে তাকে ফেরানো খুব কঠিন। তাকে ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে শক্ত উদ্যোগ নিতে হবে।’
জানা গেছে, বেনজীরের ৬ দেশের পাসপোর্ট রয়েছে। আইজিপি থাকাকালে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি তুরস্ক, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সেন্ট লুসিয়ার পাসপোর্ট নেন। সরকারি চাকরিতে থেকেও বেসরকারি চাকরিজীবী দেখিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরির ঘটনায় বেনজীরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। ৬ দেশের পাসপোর্ট থাকলেও তিনি দুবাইয়ে বড় ব্যবসার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। দুবাইয়ে তার বাড়ি কেনাবেচা, রেস্টুরেন্ট ও গাড়ির ব্যবসা রয়েছে। সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর বন্ধু শহিদুল ইসলামের সঙ্গে তিনি যৌথভাবে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।
পুনরায় জামিন বাতিল এবং গ্রেপ্তার আতঙ্কে বেনজীরের দুবাইয়ে ফেরার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করা হতে পারেÑএমন আতঙ্কে ছিলেন তিনি। যার কারণে জামিন পেয়েই তিনি দুবাই ত্যাগ করেন। তার বিদেশে আত্মগোপন বা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বাংলাদেশের পুলিশ ধারণা করছে।
দুবাইয়ে পাঠানো নথি খতিয়ে দেখার পরামর্শ
বেনজীরের বায়োডাটা তৈরি, দুদকের মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগসহ ২৪৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্ট গত ২০ জুন দুবাই পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। ওই নথিতে গলদ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধবিজ্ঞানীরা।
ভারত, থাইল্যান্ড ও নেপালÑএই তিন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি রয়েছে। কিন্তু আরব আমিরাতের সঙ্গে নেই। বেনজীর দুবাইয়ে শুধু পলাতক আসামিই নন, তিনি ওই দেশে বিনিয়োগকারীও। মানিলন্ডারিং মামলায় বিভিন্ন দেশের অনেক আসামি দুবাইয়ে বসবাস করছেন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ওইসব আসামিকে ফেরতের ব্যাপারে একাধিকবার বিভিন্ন দেশ চিঠি দিলেও তাদের ফেরত দেওয়ার নজির খুবই কম। তবে খুনের মামলার আসামিদের বেলায় দুবাই পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে থাকে। বেনজীরের নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০টি মামলার তদন্ত চলমান। তাকে কেন ফেরানো গেল না এবং পাঠানো নথিতে গলদ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধবিজ্ঞানীরা।
আরো শক্ত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেনজীর দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সরকারের ভেতরে আত্মবিশ্বাস ছিল যে, তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে। দুবাই পুলিশ এবং কূটনৈতিক চ্যানেলেও যোগাযোগ শুরু করে সরকার। দুবাই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে এ নিয়ে স্কাইপিতে তিনবার কথা বলে। তারা প্রত্যেকবারই বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল।
কিন্তু ২০ জুন ডকুমেন্ট পাঠানোর পর তাদের আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়। তাকে ফেরানো যাবে কি না, তা নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বেনজীরকে ফেরানো নিয়ে আরো শক্ত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কূটনৈতিক চ্যানেলেও বড় উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল। বেনজীর যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে পালিয়ে গেছেন, সেটিও বিস্তারিত আকারে তুলে ধরা দরকার ছিল। তাহলেই তাকে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো চিন্তা করত দুবাই সরকার।
সূত্র জানায়, বেনজীরকে ফেরানোর ক্ষেত্রে ইন্টারপোলে আরো একাধিক চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বেনজীর ২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক এবং ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ছিলেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। অবসরের পর তিনি রংধনু গ্রুপের সঙ্গে ব্যবসায় সম্পৃক্ত হন। অবসরে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ মে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রছায়ায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই পালিয়ে যান। মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বহু মামলায় অভিযুক্ত বেনজীরকে ধরতে গত বছরের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ওই নোটিসের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করে দুবাই পুলিশ।
জানা গেছে, বেনজীরের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, শাপলা চত্বর গণহত্যা ও গুমের অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীরের নামও ছিল।
সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নতুন করে সরব হয়েছিলেন বেনজীর। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জুম মিটিং করে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তার দুটি অডিও ভাইরাল হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি তার ওই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানায় পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।
এর আগে ৬ ফেব্রুয়ারি ভাইরাল হওয়া এক অডিওতে বেনজীরকে বলতে শোনা গেছে, আওয়ামী লীগ যখন সংগঠিত হবে, তখন পুলিশের উপস্থিতি আপনাদের সামনে থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার ওই অডিও প্রকাশের পর পুলিশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বেনজীরকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের পলাতক ও দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তা’ বলে অভিহিত করে এবং তার এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।
বেনজীর যখন র্যাব ডিজির দায়িত্বে ছিলেন, তখন র্যাবে গুম, অপহরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেশি ঘটেছিল। সে সময় র্যাবের তথাকথিত মাদকবিরোধী অভিযানে ক্রসফায়ারে অসংখ্য নিহতের ঘটনায় দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। এছাড়াও ডিএমপির কমিশনার থাকাকালে বিরোধী দল দমন-নিপীড়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ডিএমপি কমিশনার থাকাকালে তিনি বলেছিলেন, ‘শিবির দেখা মাত্রই গুলি’। তার এই বক্তব্যে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ক্র্যাকডাউনে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার নামে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ১৭ মামলা, দুদকের ৬টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) ৩টি পরোয়ানা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।







