‘ম্যাম, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় আমি কত পেয়েছি?’—কয়েক দিন আগেও প্রশ্নটি ছিল নিতান্তই স্বাভাবিক। এ প্রশ্নটিই এখন বারবার ফিরে আসছে শিক্ষিকা সুমাইয়া বেগমের মনে। যাকে নম্বরটি জানানোর কথা ছিল, সেই শান আর নেই।
চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর রোল নম্বর ছিল এক। ১০ আগস্ট জীববিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার খাতাও জমা দিয়েছিল শান। তখন কে জানত, সেই খাতাটিই কিছুদিনের মধ্যে তার কাছে শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে।
পরদিন ম্যামের কাছে নিজের প্র্যাকটিক্যালের নম্বর জানতে চায় শান। বিষয়টি তাকে কিছুটা অবাক করেছিল, কারণ সাধারণত পরীক্ষা দেওয়ার পর নিজে থেকে নম্বর জানতে চাইত না শান। ম্যামকে শান বলেছিল, ‘ম্যাম, আপনি বলছেন এবার আমি বাসায় ভালো করে পড়ছি, পরীক্ষায়ও লিখছি। তাই নম্বরটা জানতে চাইছি। নম্বর জানালে খুশি হতাম।’
প্রিয় শিক্ষার্থীর সেই কথাগুলো এখন লুকিয়ে লুকিয়ে উকি দিচ্ছে বিষাদের স্মৃতি হয়ে। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে সুমাইয়া বেগম লেখেন, ‘শান, তোমার প্র্যাকটিক্যালের নম্বর হয়তো আর তোমাকে বলা হলো না।’
তিনি লেখেন, একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রের খাতা দেখা, নম্বর দেওয়া ও ফল জানানো তার কাছে প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু কোনো কোনো খাতা হঠাৎ স্মৃতির খাতায় পরিণত হয়। শানের প্র্যাকটিক্যালের খাতাটি এখন শুধুই একটি স্মৃতি।
চট্টগ্রামের হালিশহরের চুনা ফ্যাক্টরি এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকত সায়েদ মুনিফ আহমেদ শান, তার আদি বাড়ি সন্দ্বীপে। চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ফুটবল খেলতে ভালোবাসত। স্কুল, বন্ধুবান্ধব আর খেলাধুলা—এই ছিল তার ছোট্ট জগৎ। ৯ আগস্ট স্কুলে পরীক্ষা ছিল শানের। দুই ঘণ্টার পরীক্ষা হলেও এক ঘণ্টার মাথায় খাতা জমা দিয়ে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে চলে যায় পতেঙ্গা সৈকতে। এরপর বিকেল তিনটার পর থেকে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সন্ধ্যা গড়িয়েও সে বাড়ি ফেরেনি।
ছেলের খোঁজে সারা রাত ছোটাছুটি করেন বাবা মাহবুবুর রহমান। বন্ধুদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে একেকজন একেক রকম কথা বলায় পরিবারের সন্দেহ বাড়ে। সেই রাতেই হালিশহর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। তিনদিন পর পতেঙ্গা থানা-পুলিশ সাগর থেকে একটি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার করে। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে পরিবার লাশ শনাক্ত করে—সেটিই ছিল শানের লাশ।
পরিবারের দাবি, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বন্ধুদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, ওই দিন শান বন্ধুদের সঙ্গে সাগরে নেমেছিল। ঢেউয়ের তোড়ে তলিয়ে যেতে শুরু করলে বন্ধুরা তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেয়। সাগরে ভেসে যায় শান। পরে তার স্কুলব্যাগটিও সাগরে ফেলে দিয়ে বাড়ি ফিরে বন্ধুরা।
এতেই পরিবারের সন্দেহ, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এর পেছনে অন্য কিছু থাকতে পারে। এ ঘটনায় শানের চার বন্ধুকে আসামি করে হালিশহর থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ চারজনকেই গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। তদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে এটি দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষেই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।







