অপরাধ করেছেন রমজান আলী। অথচ সেই অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের আসামি হয়েছেন সোনা মিয়া! শুধু তাই নয়, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর গ্রেপ্তার করে প্রকৃত সোনা মিয়াকেই পাঠানো হয়েছে কারাগারে। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। অথচ তার দাবি, তিনি ওই মামলার আসামিই নন।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে। আদালতের নির্দেশে পুলিশের নতুন করে করা তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের নতুন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে সোনা মিয়া পরিচয়ে মামলায় আসামি হন। পরে ওই পরিচয়েই তার বিরুদ্ধে বিচার চলে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার পাঁচ আসামির সঙ্গে তারও মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।
এদিকে রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একটি দল ওয়ারেন্টমূলে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর তিনি জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান, তিনি ওই ইয়াবা মামলার আসামি নন।
পরে জেল সুপার বিষয়টি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে জানান। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে গত ২ জুলাই পুলিশ নতুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওইদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’, পিতা নজির আহমদ, ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানার পুলিশ দিয়ে অনুসন্ধান করেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবুও ওই ব্যক্তিকে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয়েই মামলায় আসামি রেখে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে যায়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর এক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টমূলে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারে যাওয়ার কয়েক দিন পর সোনা মিয়া জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। তিনি বিষয়টি অস্বীকার করে জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন।
তার আবেদনের পর বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। আদালতের নির্দেশে পুলিশ ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার পরিচয়, শারীরিক গঠন ও পারিবারিক তথ্য যাচাই করে।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির পিতার নাম মৃত নজির আহমদ, মাতার নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। ছেলের নাম মোহাম্মদ আলী। তার উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি।
শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে তার বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার পিতার নামও মৃত নজির আহমদ উল্লেখ থাকলেও তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা।
এই সোনা মিয়ার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি এবং সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করেন।
কোনো একসময় সোনা মিয়ার জন্ম নিবন্ধন কার্ড রমজানের কাছে থেকে যায়। ওই জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই উল্লেখ করেছিলেন যে ‘সোনা মিয়া’র নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। তাহলে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি কীভাবে আদালত থেকে জামিন পেলেন এবং পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মামলাটি দায়ের থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তার ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে তা যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সোনা মিয়ার প্রকৃত নাম যে রমজান, সেটিও তদন্তে বের করা হয়নি। ফলে প্রকৃত আসামি জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। পরে তার পরিবর্তে প্রকৃত সোনা মিয়াকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।
আব্দুল মান্নান আরো বলেন, আদালতের নির্দেশে পুলিশের প্রতিবেদনে ২০২০ ও ২০২৬ সালের দুই ব্যক্তির তথ্যের মধ্যে পার্থক্য উঠে এসেছে। এখন আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টির আইনগত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।
কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, তার স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়াননি এবং কারাগারেও যাননি। হঠাৎ র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পর তারা জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবার একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, তার স্বামী রোহিঙ্গা নন; তিনি রামু উপজেলার বাসিন্দা। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। ওই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল বলে তারা জানতেন। অথচ এখন সেই মামলায় তার স্বামীকে আসামি করা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী আদালতের নির্দেশে পুলিশ নতুন প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ঘটনার পর আদালতের আদেশের দিকে তাকিয়ে আছেন কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ও তার পরিবার। একই সঙ্গে সামনে এসেছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আসল রমজান এখন কোথায়? তার অপরাধে কেন সোনা মিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের আসামি হয়ে কারাগারে থাকতে হচ্ছে? আর তদন্ত, আসামির পরিচয় যাচাই ও জামিনের পুরো প্রক্রিয়ায় কার বা কাদের গাফিলতি ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।







