বিশ্বকাপ কি বিক্রির পণ্য? বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরের একটি অংশ কি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া যায়? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ফুটবল বিশ্বে। কারণ, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করেছে ফিফা। আর সেই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার তোলার লক্ষ্য নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফার সবচেয়ে লাভজনক প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনা করবে নতুন প্রতিষ্ঠান ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস (এফএফই)’। যদিও ফিফা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা নিজের কাছেই রাখবে এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে, তবু এই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কাঠামোয় বাইরের বিনিয়োগকারীদের প্রবেশের দরজা খুলে যাচ্ছে।
তবে প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি কার্যকর হতে হলে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের পাশাপাশি ৩৭ সদস্যের ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন।
ফিফার দাবি, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য লাভ নয়; বরং বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়ন। নতুন ফিফা ফাস্ট-ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম (এফএফএফপি)-এর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হবে। এই তহবিল থেকে প্রতিটি সদস্য দেশ বিশেষ ও জরুরি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ২ কোটি ডলার পর্যন্ত সহায়তা নিতে পারবে।
শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে ফিফার ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামের আওতায় চার বছরে প্রতিটি সদস্য দেশ যে ৮০ লাখ ডলার পায়, তা ২০২৭-৩০ মেয়াদে বেড়ে হবে ২ কোটি ডলার। ২০৩১-৩৪ চক্রে তা বাড়িয়ে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ২০৩৫-৩৮ মেয়াদে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ আগামী এক দশকে উন্নয়ন অনুদান প্রায় তিন গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে ফিফা।
পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, ‘ফুটবল মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের এক অসাধারণ চালিকাশক্তি। এর বাণিজ্যিক মূল্য যেন বিশ্বের সব দেশের মধ্যে আরো ন্যায়সংগতভাবে বণ্টিত হয়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির জন্য এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে ফুটবলের বাণিজ্যিক দিকটি একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং এর সুফল সারা বিশ্বের ফুটবলে আরো ভালোভাবে পাবে। এখান থেকে প্রাপ্ত আয় আরো ভালোভাবে ভাগাভাগি হবে। প্রতিটি সদস্য দেশের উচিত নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে তোলার সুযোগ পাওয়া।’
এই প্রকল্পের আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যান। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী দলের নেতৃত্ব দিতে পারে থ্রাইভ ইটারনাল, যার প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন উদ্যোক্তা জশুয়া কুশনার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। এছাড়া অ্যাপোলো স্পোর্টস ক্যাপিটালও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের তালিকায় রয়েছে।
কিন্তু ফিফার এই ঘোষণার পরপরই শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘ফিফার এই সিদ্ধান্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এটি করা উচিত নয়। ফুটবলের আত্মা ও শাসনব্যবস্থা বিক্রির সম্পদ নয়। ফুটবল ফিফার একার নয়, এটি বিক্রি করারও অধিকার তাদের নেই।’
উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের আগে এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা করা হয়নি। তারা বলেছে, ‘এত বড় একটি সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রক্রিয়া ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া সামনে আনা হয়েছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।’ একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও। তাদের মতে, পর্যাপ্ত তথ্য না দিয়েই এমন গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা সামনে আনা হয়েছে।
সমালোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে স্পেনের লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘এটি কোনো সংস্কার নয়। এটি ভবিষ্যতের ফুটবলকে বন্ধক রেখে চালানো একটি নির্বাচনি প্রচার। ইনফান্তিনো ফিফার সমস্যার সমাধান করার পরিবর্তে তিনিই সমস্যার অংশ হয়ে উঠেছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান জেমি রাসকিনও কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্য আগেই সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এখন নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ ফুটবলকে আরো করপোরেট নিয়ন্ত্রণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তবে ফিফার পরিকল্পনার সমর্থকও কম নন। তাদের যুক্তি, স্পেনের লা লিগা, ফ্রান্সের লিগ ওয়ানসহ বিশ্বের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থা ইতোমধ্যে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগ এনেছে। ফলে ফিফার এই পদক্ষেপ পুরোপুরি নজিরবিহীন নয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ফিফা এখন দুর্বল নয়। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৬ চক্রে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ মিলিয়ে আয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা আগের চার বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তারপরও ইনফান্তিনোর বিশ্বাস, আলাদা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলে বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ এবং নারী ফুটবলের প্রতিযোগিতাগুলো থেকে আরো বেশি রাজস্ব অর্জন সম্ভব হবে।
এখন নজর ফিফার ২১১ সদস্য দেশের দিকে। তারা যদি এই প্রস্তাবে সবুজ সংকেত দেয়, তাহলে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক রূপান্তরের সাক্ষী হবে ফুটবল বিশ্ব। আর যদি বিরোধিতাই জোরালো হয়, তাহলে ইনফান্তিনোর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলোর একটি বাস্তবায়নের আগেই থমকে যেতে পারে







