২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ওই দিন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের প্রথম স্থায়ীভাবে ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাসে পরিণত হয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী দুপুরে শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটকের তালা ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মিছিলে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো ক্যাম্পাস আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে তারা মাদার বখশ হলে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গালিব মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে পালিয়ে যান। তার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে বিজয় ২৪ হল (তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল) থেকে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটে। হলের কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে এবং শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বাবুকে পুলিশ সরিয়ে নেয়। এ সময় ছাত্রলীগের দপ্তর সেল থেকে একটি পিস্তল, রামদা, দা, রড ও মদের বোতল উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেন শিক্ষার্থীরা।
এছাড়াও ১৬ জুলাইয়ের পর থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক উপস্থিতির অবসান ঘটে। পরবর্তী ৫ আগস্ট পর্যন্ত তারা আর ক্যাম্পাসে ফিরে এসে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি।
এ বিষয়ে সাবেক সমন্বয়ক এবং বর্তমান রাকসুর জিএস সালাউদ্দীন আম্মার বলেন, "১৪ জুলাই আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে 'রাজাকার রাজাকার' স্লোগানে আন্দোলনের সূচনা করি। পরদিন ১৫ জুলাই আমরা প্যারিস রোডে একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করি, যার প্রেক্ষিতে ঢাবি ও জাবিতে হামলা হয়। তখন সমালোচনা উঠে রাবির শিক্ষার্থীরা মাঠে নেই। তাই ১৬ জুলাই সক্রিয় মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিই।ততদিনে আমাদের আগের কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি কাজ করছিল, যেখানে মোকাররম ভাই, আনোয়ার ভাইসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ছিলেন। খবর পাই, ছাত্রলীগ হামলার পরিকল্পনা করেছে এমনকি মেয়র লিটন রড-পাইপ কেনার জন্য পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছে বলেও জানা যায়। মোকাররম ভাই সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আউট ফান্ডিং করে জি আই পাইপ কিনে, তার মাথায় পতাকা লাগিয়ে নিরাপদে তা ক্যাম্পাসে আনেন। আমি এক ভাইয়ের বাসায় থেকে পরিস্থিতি সমন্বয় করি এবং পরে বাজার থেকে পাইপ সংগ্রহ করি।
তিনি আরও বলেন, "বিনোদপুরে মাইকিং করে সবাইকে মাঠে আসার আহ্বান জানানো হয়। এরপর ক্যাম্পাসজুড়ে ছাত্রলীগ বিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মেয়েরা হলের তালা ভেঙে বের হয়ে আসে, ক্যাম্পাসে টহল দিয়ে ছাত্রলীগের টর্চার সেল ভেঙে দেওয়া হয়। ১৬ জুলাই একদিকে ছিল ঐতিহাসিক ছাত্রলীগ নির্মূলের দিন, অন্যদিকে ছিল আবু সাঈদ ভাই ও ওয়াসিফ ভাইয়ের শাহাদাতের বেদনার দিন। আমরা দিনটিকে যেমন বিজয়ের, তেমনি শোকের দিন হিসেবে মনে রাখি। রাজশাহীর আন্দোলনের ভিত্তি গড়া হয় ১৪ জুলাই রাজাকারবিরোধী স্লোগান, ১৬ জুলাই ছাত্রলীগমুক্তি এবং ২৯ জুলাই কারফিউ ভেঙে ৮৫ জনের 'সেম সেম ডিক্টেটর' স্লোগানে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ভারতীয় সিম ব্যবহার করে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাই।"
সাবেক সমন্বয়ক তাসীন খান বলেন, "১৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার জন্য একটি স্মরণীয় দিন। এই দিন ছাত্রলীগ বিতাড়িত করে আমরা রাবিকে মুক্ত করি। এই দিন ছাত্রলীগ সবার উপর হামলা করবে এরকম একটা আশঙ্কা সবার মধ্যেই ছিল, আগের রাত থেকে প্ল্যান ছিল হল থেকে একটি টিম আগে বের হবে এবং বিনোদপুর থেকে মিছিল করে সন্ধ্যার দিকে ক্যাম্পাসে ফিরবে। বিকাল থেকেই পরিকল্পনা চলছিল কিভাবে তাদেরকে প্রতিহত করা যায়।"
তিনি আরও বলেন, "বিনোদপুর থেকে শিক্ষার্থীদের সাথে স্থানীয় লোকজনের প্রবেশ করে এবং সবাই যখন জানতে পারে এভাবে মানুষজন ঢুকছে ক্যাম্পাসে তখন আর কেউ হলে বসে থাকে নাই। এই আন্দোলনে বিশেষ করে স্থানীয়দের অনেক ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতে হল গুলোতে যার কাছে যা ছিল বিশেষত মেয়েদের হলে ঝাড়ু লাঠি যার কাছে যা ছিল সবাই তাই নিয়ে বের হয়ে এসেছিল। প্রবল প্রতিরোধ ও ক্ষোভের ফলে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়। আরেকটা বিষয় হলো আমাদের সাবেক সমন্বয়ক রিদম ভাইয়ের হাতুড়ি এটি একটি আইকনিক হাতুড়ি। এটি ১৬ জুলাই এর স্মৃতিকে আরও বেশি জাগ্রত করে তোলে।"
উল্লেখ্য, রাবির এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধই পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ বিতাড়নের অনুপ্রেরণা দেয় এবং ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করে।







