জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়ার জন্য বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আগামী রোববার-১০ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত এই বোর্ডের শিডিউল করা হয়েছে। এসব বোর্ডে ১২ টি বিভাগের মোট ১৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতি দেয়া হবে। এর মধ্যে ৮ জন শিক্ষকই ফ্যাসিস্টের দোসর ও জুলাইয়ে ছাত্র গণহত্যার সমর্থক ছিলেন। ২০২৪ এর ৪ আগস্ট আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে জবিতে আয়োজিত নীল দলের মানববন্ধনে অংশ নিয়েছিলেন তারা৷
তালিকায় থাকা আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা হলেন-প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোসা: উম্মে হাবিবা খাতুন, ফিন্যান্সে সহকারী অধ্যাপক মুক্তা রাণী সরকার ও সোনিয়া মুনমুন, ফার্মেসী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর ড. মো. মনির হোসেন, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাবিনা ইয়াসমিন, আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা হাসান, মার্কেটিং বিভাগের এর সহকারী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার বালো, দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজিয়া আফরিন।
এই ৮ জনের মধ্যে ৩ জন সহযোগী অধ্যাপক থেকে পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক হবেন আর ৫ জন সহকারী অধ্যাপক পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক হবেন। এছাড়া বোর্ডে কয়েকজন ফ্যাসিস্ট শিক্ষককে অধ্যাপক গ্রেড-২ ও গ্রেড-১ এ পদোন্নতি দেয়া হবে বলে জানা যায়।
এর মধ্যে ফার্মেসী বিভাগের মনির হোসেন, মার্কেটিং বিভাগের বিদ্যুৎ কুমার বালো ও দর্শন বিভাগের সাজিয়া আফরিন ঢাবিতে সরাসরি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তালিকায় থাকা ৮ শিক্ষকের সবাই ২৪ এর জুলাইয়ে গণহত্যায় সমর্থন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। ২০২৪ এর ৪ আগস্ট আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে জবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নিয়েছিলেন তারা৷ উক্ত মানববন্ধনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দমনে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে আরও বেশি বল প্রয়োগের পরামর্শ দেন তারা।
এছাড়া ফার্মেসী বিভাগের মনির হোসেন ফ্যাসিস্ট সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সহকারী প্রক্টরের পদ ভাগিয়ে নেন। আওয়ামী সময় থেকে অদ্যাবধি ছাত্রী হলের হাউস টিউটর পদে আছেন দর্শন বিভাগের শিক্ষক সাজিয়া আফরিন।
জানা যায়, গত সপ্তাহে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন জবির আওয়ামীপন্থী নীল দলের একটি প্রতিনিধি দল। এই দলে ছিলেন শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও অর্থনীতি বিভাগের ড. আইনুল ইসলাম ও অপর সাবেক সভাপতি এবং সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক ড. মো. আবুল হোসেন ও সাবেক সেক্রেটারি এবং রসায়ন বিভাগের শিক্ষক লুৎফর রহমান ও নীল দলের নেতা, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ড. মো. কামাল হোসেন। তারা আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের পদোন্নতি দিতে উপাচার্যকে চাপ প্রয়োগ করেন। এক পর্যায়ে উপাচার্য পদোন্নতি বোর্ড আয়োজনে সম্মত হন।
এর মধ্যে সমাজকর্ম বিভাগের ড. মো. আবুল হোসেন, রসায়ন বিভাগের ড. একেএম লুৎফর রহমান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ড. মো. কামাল হোসেন বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা পেশাজীবী সমন্বয় উপকমিটিতে জবির শিক্ষক প্রতিনিধি হিসাবে ছিলেন। ও তারা প্রধানমন্ত্রীর অফিসে গিয়ে জুলাই গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছেন।
আওয়ামী শাসনামলে বিএনপি-জামায়াতপন্থী ট্যাগ দিয়ে মিটিং শুরুর ২ ঘন্টা আগে পূর্বনির্ধারিত পদোন্নতি ও নিয়োগ বোর্ড বন্ধের ঘটনা ঘটেছিল। সকল শর্ত ও ক্রাইটেরিয়া পূরণ করার পরও এভাবে বঞ্চিত হয়েছিলেন যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক শিক্ষক।
এদিকে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের পদোন্নতির সংবাদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফ্যাসিস্ট আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়িত ও বঞ্চিত বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, উপাচার্য রইস উদ্দিন স্যার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময় সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার ছিলেন। জুলাইয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন না হলে আজকে তিনি উপাচার্য তো হতে পারতেন না, তাকে কারাগারে থাকতে হত। হতাশা প্রকাশ করে তারা বলেন, এখন নীল দলের নেতারা তেলবাজি করে পদোন্নতি ও বিভিন্ন পদ বাগিয়ে নিয়ে পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে আপনাদের দিকে বিষাক্ত ছোবল মারবে না এর নিশ্চয়তা কে দিবে।
এ বিষয়ে জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক বলেন, আমরা শিক্ষক সমিতি, এ বিষয়ে আগে থেকে কিছু জানতাম না। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। এখানে প্রশাসন নিজেদের মতো করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যদি সত্যিই এমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই এর বিরোধিতা করব। জুলাই আন্দোলনের সময় তারা সরাসরি আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
পদোন্নতি বোর্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্বিবদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক. ড. সাবিনা সারমিন বলেন, এখনো বোর্ড হয়নি, বোর্ড বসলে তখন দেখা যাবে, কাকে পদোন্নতি দেয়া হবে বা হবে না। কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা থাকলে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে তিনি সরাসরি উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার এর সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. শেখ গিয়াস উদ্দিন ও উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইস উদ্দিনকে রোববার সন্ধা ৭ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত একাধিকবার ফোন দেয়া হয়। কিন্তু কেউই ফোন রিসিভ করেনি।







