রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জনের ওপর হামলার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছে হল প্রশাসন। হামলার একাধিক ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পরও চিহ্নিত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ না করে মামলা করায় ক্ষোভ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
তাদের অভিযোগ, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পরও অজ্ঞাতনামা মামলা করা হয়েছে, যা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি করবে।
গত সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. মনির হোসেন বাদী হয়ে মতিহার থানায় মামলাটি করেন। মামলায় কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তবে মামলার বাদী মনির হোসেন দাবি করেছেন, তাকে জোর করে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে এবং মামলার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না।
এর আগে, গত রবিবার (৪ অক্টোবর) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। আহতদের প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে এবং পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীবের নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ ওঠে।
হামলার পরপরই ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকেরা হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে মামলা ও গ্রেফতারের দাবি জানান। তবে পরে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা মামলা করায় ক্ষোভ তৈরি হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ফেসবুকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে মানহানিকর বিভিন্ন পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। এর ধারাবাহিকতায় রবিবার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী লাঠিসোঁটা নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান হলে প্রবেশ করেন। তারা হলটির আবাসিক বা অনাবাসিক শিক্ষার্থী নন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তারা হলের ২১৪ নম্বর কক্ষ তল্লাশি করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, ওই শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হওয়ার সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কয়েকজন সাংবাদিক তাদের সামনে গিয়ে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীরা হাতে থাকা লাঠিসোঁটা দিয়ে সাংবাদিকদের এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন। পরে আহত সাংবাদিকদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সাক্ষী হিসেবে একজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও দুজন নিরাপত্তা প্রহরীর নাম এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকজন ঘটনা সম্পর্কে জানেন ও শুনেছেন বলেও এজাহারে বলা হয়েছে।
মামলার বাদী ও শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. মনির হোসেন দাবি করেছেন, মামলার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না এবং তাকে জোর করে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “সোমবার (৫ অক্টোবর) প্রভোস্ট মাহবুবুর রহমান স্যার সাত্তার ভাই ও আমাকে থানায় যেতে বলেন এবং আমাকে বলেন, আমাদের কিছু করতে হবে না, শুধু মতিহার থানায় গিয়ে স্বাক্ষর করতে হবে। আমাকে জোর করে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। মামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। সেখানে গিয়ে স্বাক্ষর করার সময় দেখি, আসামিদের নাম অজ্ঞাত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। হলের প্রভোস্ট আমাকে জানিয়েছেন, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে রয়েছেন।”
হামলার একাধিক ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পরও হামলাকারীদের নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা মামলা করায় প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকেরা।তাদের দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে স্পষ্ট। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমেও হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও তাঁদের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি ইরফান তামিম বলেন, “ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের নামে মামলা এবং গ্রেফতার করার দাবি জানিয়েছিলাম। আমরা এই দাবিতে অনড় ছিলাম। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের আশ্বস্ত করে, পরদিন দুপুর ১২টার মধ্যে মামলা করবে এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু তারা যে মামলা করেছে, সেটি অজ্ঞাতনামা। প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে ঘোরাচ্ছে এবং প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত করছে। আসামিদের বাঁচানোর জন্য বা কোনো ছাত্রসংগঠনকে বাঁচানোর জন্য এমনটি করা হচ্ছে কি না, তা প্রশ্ন রয়ে যায়।”
আহত বিডিনিউজ২৪-এর রাবি প্রতিনিধি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটির সহসভাপতি আরিফুজ্জামান কোরবান বলেন, “ভিডিও ফুটেজ এবং যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও হল প্রশাসন অজ্ঞাতনামা মামলা করল, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আপডেট নেই তাদের পক্ষ থেকে। আমার মনে হয়, তারা এই অজ্ঞাত মামলাটি করেছে হামলাকারীদের বাঁচানোর জন্য। কারণ এতে তদন্তের জন্য অনেক সময় লাগবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা বলেছে, আমরা সেটির অপেক্ষা করছি।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ পরান বলেন, “বিভিন্ন ফুটেজে হামলাকারীদের স্পষ্ট বোঝা গেলেও প্রশাসন অজ্ঞাতনামা মামলা করেছে। এটা খুবই দুঃখজনক। ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতার ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করতে হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, “প্রশাসন মামলা করেছে, এটা আমরা স্বাগত জানাই। কারণ, এ ধরনের ঘটনায় মামলা করা মানে প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে চাচ্ছে। তবে মামলায় যাঁদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে, তাদের অজ্ঞাতনামা রাখার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।”
মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কবির বলেন, “সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জনের ওপর হামলার ঘটনায় একটি অজ্ঞাতনামা মামলা করা হয়েছে। আমরা মামলাটি নিয়েছি। এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বলেন, “এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। থানায় হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলাও করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”
রাবি উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে মামলা করে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা করলে সেটিই বেশি কার্যকর হতো।”
উল্লেখ্য, সাংবাদিকসহ ১০ জনের ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামি করার প্রতিবাদে গত সোমবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকেরা।
কর্মসূচি থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো-হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সাময়িক বহিষ্কার করতে হবে, তিন দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে শুক্রবারের মধ্যে জরুরি সিন্ডিকেট ডেকে তাদের স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে; যাদের ছাত্রত্ব নেই, তাদের সনদ বাতিল করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে। শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ ক্যামেরার ফুটেজ ডিলিট করে সন্ত্রাসীদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগে তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ঘটনার সময় উপস্থিত থেকেও নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগে প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরদের পদত্যাগ করতে হবে।
আন্দোলনকারীদের দাবির পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে বাকি দাবিগুলো বাস্তবায়ন ও হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত শেষ করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিন দিন সময় নেয় প্রশাসন।







