নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রকাশ্য রাজনীতিতে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়লেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে ছদ্মবেশে সক্রিয় রয়েছেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ না থাকলেও গোপনে সংগঠিত হওয়া, পরিচয় গোপন রেখে অন্য প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া এবং সুযোগ বুঝে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা—এমন বিভিন্ন কৌশলে টিকে থাকার চেষ্টা করছে সংগঠনটির বড় একটি অংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে হলভিত্তিক দখল এবং দৃশ্যমান শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতিতে ছাত্রলীগের পতন হলেও সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ ক্যাম্পাসগুলোয় এখনো সক্রিয়। কখনো পদত্যাগের অজুহাতে, কখনো পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন হলে অবস্থান করছেন ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী। তারা সরাসরি সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক, টেলিগ্রাম গ্রুপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্য ছাত্রসংগঠনের ছত্রছায়ায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকাশ্য ও গোপন—দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে নিষিদ্ধ সংগঠনটি। একাংশ ক্যাম্পাসের ভেতরে এবং অন্য অংশ ক্যাম্পাসের বাইরে সক্রিয়। ক্যাম্পাসভিত্তিক অংশটি মূলত তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে। তারা বিভিন্ন হলে নজরদারি চালিয়ে সংগঠনের উচ্চপর্যায়ে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করছে। পাশাপাশি বাইরের অংশটিকে কর্মসূচি সফল করতে সব ধরনের সহযোগিতাও করছে তারা।
যেভাবে সক্রিয় নিষিদ্ধ সংগঠনটি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্যাম্পাসের আশপাশের আজিমপুর, চানখাঁরপুল, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট ও মিরপুর এলাকায় গোপনে অবস্থান করছেন সংগঠনটির সিংহভাগ নেতাকর্মী। তারা ঝটিকা মিছিল ও পোস্টারিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছেন।
গত ২ মে সকালে ঢাবির স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারহান তানভীর নাসিফের নেতৃত্বে ঝটিকা মিছিল বের করে নিষিদ্ধ সংগঠনটি। পরে পুলিশ নাসিফ ও তার সঙ্গে থাকা মাইক্রোবাসচালক রুবেল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ১১ মে আদালত তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
এরপর ২০ মে ঢাবির অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্রলীগের ব্যানার নিয়ে অবস্থান নেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের প্রশিক্ষণ সম্পাদক টিএসআই জাওয়াদ এবং সূর্য সেন হল ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ওমর ফারুক।
এছাড়া ১ জুন ছয় দফা দাবি নিয়ে ডাকসুর সামনে মৌন মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এতে উপস্থিত ছিলেন—ঢাবি ছাত্রলীগের উপ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ নাঈম, স্কুলছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শিবলী সাদিক, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক রাজিব জামান, বিজয় একাত্তর হলের সাংগঠনিক সম্পাদক মুহিবুল ইসলাম বিজয়, স্যার এ এফ রহমান হলের উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক ইমরান হোসাইন এবং হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের উপ-দপ্তর সম্পাদক সাব্বির হোসাইন খোকা।
সবশেষ ৫ জুন ভোর ৫টায় ঢাবি ছাত্রলীগের উপ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ নাঈমের নেতৃত্বে দুটি বাইকে পাঁচজন এসে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের মূল ফটকে ছাত্রলীগের ব্যানার টাঙান।
ছদ্মবেশে তৎপর ছাত্রলীগ
গত ডাকসু নির্বাচনে গোপনে প্যানেল দেয় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। পাশাপাশি হল সংসদ নির্বাচনেও ছিল উল্লেখযোগ্য তৎপরতা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের পক্ষে সূর্য সেন হল ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক আয়ান আব্দুল্লাহ মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে, উপ-শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক মোহাম্মদ রিয়াজ মাতাব্বর ক্রীড়া সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ১৫ জুলাই ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের নেতৃত্বে ঢাকা মেডিকেল মোড়ে ছাত্রলীগের পক্ষে অবস্থান নেন। এর মধ্যে আয়ান আব্দুল্লাহ হল ছাত্রলীগের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী ছিলেন।
এদিকে, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতন হলে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকেন তারা। পরে সুযোগ বুঝে তারা ক্যাম্পাসে এসে ধীরে ধীরে ছাত্রলীগের পক্ষে কাজ শুরু করেন।
এছাড়া ডাকসু নির্বাচনে ‘ঈশা খাঁ’ বাসরুটের সাবেক সভাপতি রাজিন হোসেন পরিবহন সম্পাদক পদে এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী আবিদ আব্দুল্লাহ ছাত্রলীগের পক্ষ হয়ে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচন করেন।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, আবিদ আব্দুল্লাহ জুলাই বিপ্লবের আগে ছাত্রলীগের কট্টর অনুসারী ছিলেন। তবে জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্রলীগের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে শিক্ষার্থীদের মাঝে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পান তিনি। ওই গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে অ্যাক্টিভিজম করতে দেখা যায় তাকে। তবে সম্প্রতি ক্যাম্পাসে ভ্রাম্যমাণ দোকান পুড়িয়ে দেওয়া এবং চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সমালোচিত হন তিনি।
এছাড়া ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে শামীম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচন করেন আরাফাত চৌধুরী। জানা গেছে, আবিদ আব্দুল্লাহ ও আরাফাত চৌধুরী ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বানীর অনুসারী। তাদের গোপন সাক্ষাতের একাধিক ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেটওয়ার্ক সক্রিয় রাখার নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন তারা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগসংশ্লিষ্টরা একযোগে একে অপরের হয়ে প্রচার চালান। সে সময় আয়ান আব্দুল্লাহ ও রিয়াজ মাতাব্বরের অনুসারী ছিলেন প্রায় ৩০ জন।
প্রচারের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আয়ান আব্দুল্লাহর পক্ষে প্রচার চালান মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রলীগ নেতা রাহিদ খান পাভেল। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য গত ৮ মার্চ শিক্ষার্থীদের হামলার শিকার হন এই ছাত্রলীগ নেতা। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডাকসু নির্বাচনে আয়ান আব্দুল্লাহ ও রিয়াজ মাতাব্বরের মাধ্যমে আসত মোটা অঙ্কের টাকা। সংগঠনটির একাধিক অনুসারী জানান, শুধু প্রবাসী ছাত্রলীগ থেকেই ফান্ডিং এসেছিল ১০ লাখ টাকা। এছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যেকে আওয়ামী নেতাদের কাছ থেকে আলাদা অর্থ সহায়তা পান। এ অর্থ সহায়তা ছিল জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকার বেশি।
ভিন্ন ব্যানারে এগোনোর নীলনকশা
ঢাবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে সাবেক ছাত্রলীগকর্মীরা রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে নতুন করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফর্ম কিংবা অরাজনৈতিক ব্যানার ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘নেক্সট জেন বাংলাদেশ’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন তৈরির চেষ্টা করছেন ক্যাম্পাসে তৎপর ছাত্রলীগের অংশটি। এ সংগঠনের প্রধান উদ্যোক্তার ভূমিকায় রয়েছেন আবিদ আব্দুল্লাহ।
আবিদ আব্দুল্লাহ জানান, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মাঝে সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চান তারা। এ কার্যক্রম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে প্লাটফর্মটির জন্য অনুদান সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ক্যাম্পাসের সচেতন শিক্ষার্থীদের নিয়ে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু করেছে সংগঠনটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাস্টারদা সূর্য সেন হল থেকে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর নেপথ্যে কাজ করছেন হল ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক আয়ান আব্দুল্লাহ, উপ-শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক রিয়াজ মাতাব্বর, গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ওমর ফারুক, সূর্য সেন হলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুন্সি রাকিব হোসেন, ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেলের জিএস প্রার্থী আরাফাত চৌধুরী এবং ফাহিম শাহরিয়ার। তারা ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের অনুসারী।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বৈঠকের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ সংগঠনটি।
এদিকে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাবেক অনেক ছাত্রলীগকর্মী নিজের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ বিরোধী ঘরানার ছাত্রসংগঠনে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ আবার সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে টিকে থাকার পথ খুঁজছেন।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখ যায়, নিষিদ্ধ হওয়ার পর দৃশ্যমান শক্তি হারালেও ছাত্রলীগের একটি অংশ ছদ্মবেশে, বিচ্ছিন্নভাবে এবং কৌশলগতভাবে নিজেদের সাইবার উপস্থিতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ফেক আইডি ব্যবহার করে হুমকি ও বুলিংয়ের ঘটনা ঘটাচ্ছে নিয়মিতভাবে।
রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ও ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, আইনি প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত এসেছে, সেটার সামাজিকীকরণ যত শক্তিশালী রূপ লাভ করবে, তারা তত বেশি ব্যর্থ হবে।
তিনি বলেন, ছাত্রলীগের ছদ্মবেশী রাজনীতি ক্যাম্পাস রাজনীতিতে এক ধরনের অদৃশ্য পুনর্বিন্যাস হয়েছে। ছাত্রলীগের বর্তমান অবস্থাকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় বলা যাবে না; বরং এটি একটি রূপান্তরকাল পার করছে। সংগঠনটির কিছু অংশ গোপনে সক্রিয় থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে আবার প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করতে পারে।
ঢাবি প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, আমরা নিষিদ্ধ যেকোনো সংগঠনের ব্যাপারে সতর্ক আছি। তারপরও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেউ কেউ অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সম্প্রতি নিষিদ্ধ সংগঠনটি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। যারা এর নেপথ্যে কাজ করছে, তাদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কার্পণ্য করবে না।
ঢাবি উপাচার্য এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠনটি প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে শিগগির ব্যবস্থা নেব।







