নেকাব পরা এক শিক্ষার্থীকে ‘মৌলবাদী’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘জঙ্গি’ বলে মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগের পর তাকে বিভাগের সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার নেওয়া কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের (২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ) একটি ক্লাসে ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। পরে বিষয়টি লিখিতভাবে বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে জানানো হলে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা ডাকা হয়। সভায় অভিযোগ পর্যালোচনার পর ওই শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট কোর্সগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের পর জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বিভাগীয় চেয়ারম্যান বা একাডেমিক কমিটির নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী উপাচার্য, একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মল্লিকার দাবি, ওই শিক্ষকের সাথে নেকাব ও হিজাব নিয়ে তার আগে থেকেই মতবিরোধ ছিল। বুধবার ক্লাস চলাকালে তিনি শিক্ষকের ডেস্কের বাম পাশে বসেছিলেন। কয়েকবার চোখাচোখি হওয়ার পর শিক্ষক তাকে সেখানে বসে থাকায় অস্বস্তি ও অনিরাপদ বোধ করার কথা জানান এবং অন্য শিক্ষার্থীদের মাঝে গিয়ে বসতে বলেন।
মল্লিকার ভাষ্য, এরপর শিক্ষক তার পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং নেকাব ইসলামের কোথায় বা কোন ফিকহে রয়েছে, তা জানতে চান। শিক্ষক হজ করে এসেছেন উল্লেখ করে মুখ খোলা রাখার বিষয়েও কথা বলেন বলে অভিযোগ তার।
মল্লিকা জানান, এর আগের একটি ক্লাসেও তাকে নেকাব নিয়ে কথা শুনতে হয়েছিল। সে সময় ওই শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, এভাবে মুখ ঢেকে চললে নেকাব খুলে দেওয়া হবে। নিজের পরিচয় নিয়ে শিক্ষকের কোনো সংশয় থাকলে অফিস সময়ে দেখা করে পরিচয়পত্র দেখানোর প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তবে শিক্ষক প্রতিদিন তাকে পরীক্ষা করে পরিচয় নিশ্চিত করতে পারবেন না বলে জানিয়েছিলেন বলে দাবি তার।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ থেকে নেকাব পরার বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ওই শিক্ষকের ক্লাসে বারবার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। তার মতে, এটি হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি আচরণের অংশ।
ইংরেজি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমিও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্লাসে ইসলামবিরোধী মন্তব্য করার অভিযোগ করেন। তার দাবি, পর্দা, মাযহাবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় নিয়ে শিক্ষককে বিভিন্ন সময় মন্তব্য করতে শুনেছেন তারা।
সুমির ভাষ্য, ঘটনার দিন তিনি শিক্ষককে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট একটি মাযহাব অনুসরণ করায় ওই ধরনের পর্দা করেন। এতে শিক্ষক ক্ষুব্ধ হয়ে কোনো মাযহাব অনুসরণ না করার কথা বলেন এবং হজ, নামাজ, রোজা ও যাকাত পালনের কথা উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সুমি আরও বলেন, পোশাক নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি শিক্ষককে প্রশ্ন করেন, শিক্ষার্থীটি এতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে সমস্যা কোথায়। তখন শিক্ষক তার বক্তব্যের বিরোধিতা করেন এবং ওই শিক্ষার্থীকে সমর্থন করার কারণ জানতে চান বলে অভিযোগ সুমির।
তার দাবি, একপর্যায়ে শিক্ষক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে সে বোমা মারতে পারে বলেও মন্তব্য করেন। এ ছাড়া আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিনের নারীদের পর্দার ধরন ভিন্ন হতে পারে এমন কথা বলার পরও শিক্ষক তাকে কথা বলার সুযোগ দেননি বলে অভিযোগ করেন সুমি।
সুমি আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষক নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দাবি করে শিক্ষার্থীদের ভয় দেখিয়েছেন এবং কেউ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এর আগে জানিয়েছিলেন, ঘটনাটি নিয়ে বিভাগ থেকে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানানো হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনা করা হবে।
এদিকে বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাসনিম সিরাজ মাহবুবের কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একইসাথে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।







