ঐতিহ্য ও লোকাচারের আবহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) উদযাপিত হচ্ছে ওরাঁও সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব ‘কারাম পূজা’। ভালো ফসল, পরিবার ও সমাজের মঙ্গল এবং সমৃদ্ধি কামনায় নাচ-গান ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় শুক্রবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী এ আয়োজন। শনিবার সন্ধ্যায় কারাম গাছের ডাল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে উৎসব।
উৎসবকে ঘিরে শনিবার সকালে ক্যাম্পাসে একটি র্যালি বের করা হয়। পরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ওরাঁও সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নেন।
আয়োজনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানান, ওরাঁও সম্প্রদায়ের কাছে কারাম বৃক্ষ পবিত্রতা, কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রতীক। প্রাচীনকাল থেকে বংশপরম্পরায় আশ্বিন মাসের শুরুতে কারাম পূজা ও সামাজিক এ উৎসব পালন করে আসছেন তারা।
উৎসবের রীতি অনুযায়ী, নারী-পুরুষ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করেন। এরপর নেচে-গেয়ে কারাম গাছের ডাল সংগ্রহ করে তা পূজার বেদিতে স্থাপন করা হয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নৃত্য, সংগীত ও লোককাহিনি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের মূল পর্ব শুরু হয়। এ সময় রঙিন পোশাকে নারী-পুরুষ সারিবদ্ধ হয়ে নৃত্য পরিবেশন করেন।
ওরাঁও সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, কারাম পূজার মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিবন্যা ও খরা থেকে মুক্তি, ভালো ফসল এবং পরিবার ও সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করা হয়। উৎসব উপলক্ষে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল, ডাল ও অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এসব উপকরণ দিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও আমন্ত্রিত অতিথিদের আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়।
উৎসবে অংশ নেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী ছবি বীর বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমতলের আদিবাসীরা প্রথমবারের মতো এই উৎসব উদযাপন করছি। প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সাড়া ও ইতিবাচক পরিবেশ পেয়ে আমরা সত্যি আনন্দিত।”
স্থানীয় বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী লালু সরদার বলেন, “কারাম পূজা আমাদের সবচেয়ে বড় ও প্রধান উৎসব। এই পূজা বা উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবার ও সম্প্রদায়ের মঙ্গল কামনা করা। এটি পালনের মাধ্যমে আমাদের বাড়িঘর, ছেলে-মেয়ে ও পরিবার-পরিজন রোগব্যাধি এবং নানা বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত থাকে।”
বাংলাদেশ ওঁরাও কালচারাল ফোরামের (ওঁরাও বিডি) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রণিকান্ত তিকী বলেন, “ওরাঁও সম্প্রদায়ের প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধারণ করাই মূলত এই উৎসবের মূল উপজীব্য। আগের চেয়ে উৎসবের আমেজ বা উদ্দীপনা কোনো অংশে কমেনি; বরং সমতল ভূমির আদিবাসীদের মধ্যে এটি পালনের আগ্রহ ও সুযোগ অনেকটাই বেড়েছে।”
আলোচনা সভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “আপনারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে অনেক পিছিয়ে পড়বেন। তাই আপনারা ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবেন। সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে। সবদিকে পদচারণা যাতে থাকে। নিজেদের কখনো নিচু ভাববেন না। নিজেদের তুলে ধরেন। নিজেদের তুলে ধরার মধ্য দিয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করেন।”
দুই দিনব্যাপী এ আয়োজন শনিবার সন্ধ্যায় কারাম গাছের ডাল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।







