শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফ।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাতে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন। বিভাগটি আন্দোলনরত শিক্ষার্থী আবু হেনাসহ অন্য শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য জানা যায়নি। রেজিস্ট্রার আব্দুল আলিম বাছিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
যদিও পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ পদত্যাগপত্রটি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রদর্শন করেন। এসময়ের কিছু স্থিরচিত্র এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। তবে বক্তব্য জানতে উপাচার্যকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে বিভাগের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের খবরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। তারা অনশন ভেঙে মঙ্গলবার থেকে নিয়মিত ক্লাসসহ অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
এর আগে কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান পদ থেকে সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফের পদত্যাগ ও বিভাগ থেকে তার অপসারণ দাবিতে রোববার বেলা ১২টা থেকে আন্দোলন শুরু করেন বিভাগটির শতাধিক শিক্ষার্থী।
এসময় তারা হাফিজ আশরাফকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। সোমবার বেলা ১২টার মধ্যে চেয়ারম্যানের পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়ে ওইদিন বিকেলে আন্দোলন স্থগিত করেন শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু দাবি না মানায় সোমবার বেলা ১২টা থেকে কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সামনে আমরণ অনশনে বসেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে সকাল ১১টার দিকে উপাচার্যের সাথে বৈঠক করেন বিভাগের শিক্ষার্থী। তবে সেখানে তাদের দাবির বিষয়ে কোনো সমাধান দিতে পারেননি উপাচার্য। অবশেষে রাত সোয়া ৮টার দিকে পদত্যাগ করেন হাফিজ আশরাফ।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান হাফিজ আশরাফুল হক একাধারে একাধিক প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই দায়িত্বগুলো পালন করতে গিয়ে গুরুত্ব দেননি শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার প্রতি। এ কারণে চার বছরের অনার্স কোর্স শেষ হতে সময় লেগেছে সাড়ে ছয় বছর এবং এক বছরের মাস্টার্স শেষ করতে লেগেছে আড়াই বছর।
তারা জানান, ২০১৭ সালে বিভাগটি চালু হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ব্যাচের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কার্যক্রম শেষ হয়েছে। চার বছরের অনার্স শেষ করতে গড়ে সাড়ে ছয় বছর এবং এক বছরের মাস্টার্স শেষ করতে আড়াই বছর সময় লাগছে। একটি শিক্ষাবর্ষ শেষ করতেই প্রায় ১৫ মাস চলে যাচ্ছে। দীর্ঘ সেশনজটের পাশাপাশি শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষক ও প্রশ্ন মডারেটর সংকটও রয়েছে বিভাগটিতে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সেশনজটের পাশাপাশি বিভাগীয় কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণ রয়েছে। চেয়ারম্যানের নেওয়া কিছু কোর্সে নির্ধারিতসংখ্যক ক্লাস হয়নি। কোনো কোনো কোর্সে দুটি ক্লাসও ঠিকমতো নেয়া হয়নি। এমনকি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর উত্তরপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি তাদের।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং আন্দোলন নিয়ে বিভাগটির পদত্যাগি চেয়ারম্যান হাফিজ আশরাফ বক্তব্য দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলেও সম্মিলিতভাবে লিখিত ব্যাখা দিয়েছেন কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ছয়জন শিক্ষক।
তারা দাবি করেছেন, সেশনজটের পেছনে জনবল ও প্রশাসনিক নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁরা বলছেন, বিভাগটি বিশেষায়িত হওয়ায় উপযুক্ত দ্বিতীয় পরীক্ষক ও প্রশ্ন মডারেটর পাওয়া কঠিন। ফলে পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশে বিলম্ব হয়। বহিরাগত পরীক্ষকদের সম্মানী, ফাইল প্রক্রিয়াকরণ এবং ডাকযোগাযোগের দীর্ঘসূত্র তাও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমকে ধীর করে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর তুলনায় বিভাগে শিক্ষকও অপ্রতুল। ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনা, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং অ্যাকাডেমিক ও দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। একাধিক ব্যাচ ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য বিভাগের বরাদ্দ রয়েছে মাত্র একটি শ্রেণিকক্ষ।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ক্লাসের চাপ সামাল দেওয়া গেলেও ২০১৯ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। এতে পাঠদানের অতিরিক্ত চাপ বর্তমান শিক্ষকদের ওপর পড়ে বলে লিখিত ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বিভাগটিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৭ সালে কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগটি চালু হয়। ওই সময় বিভাগটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফকে। সেই থেকে একটানা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ তিন বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সেখানে প্রায় ১০ বছর ধরে একাই চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন হাফিজ আশরাফ। এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সহ একাধিক প্রশাসনিক দায়িত্ব একই পালন করছেন তিনি। অবশেষে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন হাফিজ আশরাফ।







