এবারের ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য গত ২০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করতে চলেছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। ঈদযাত্রায় ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি পর্যবেক্ষণের এক সংক্ষিপ্ত সমীক্ষা তুলে ধরে বুধবার (১৮ মার্চ) দেশের গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এমন অভিযোগ করেন।
গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বার্তায় বলা হয়, সরকারি ঘোষণা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির বাস-মিনিবাসে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। বুধবার থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীর সিটিবাসেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। নৌপথের বেশির ভাগ রুটে এমন নৈরাজ্যের চিত্র দেখা গেলেও সরকার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে মালিকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছে।
এবারের ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চালাচ্ছে অভিযোগ করে বার্তায় বলা হয়, ঢাকা থেকে পাবনা নিয়মিত ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার বাস ভাড়া ১২শ টাকা, ঢাকা থেকে নাটোর নিয়মিত ৫৫০ থেকে ৫৮০ টাকার বাস ভাড়া ১২শ টাকা, ঢাকা থেকে রংপুর নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ১৫শ টাকা, ঢাকা থেকে নোয়াখালীর নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা থেকে লক্ষীপুরের নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৭০০ টাকা, ঢাকা থেকে রামগঞ্জ নিয়মিত ৩৫০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ লোকাল বাসে ২৫০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা, ঢাকা থেকে খুলনা নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, চট্টগ্রাম থেকে লক্ষীপুর নিয়মিত ৪০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, চট্টগ্রাম থেকে ভোলা নিয়মিত ৪৫০ টাকার বাস ভাড়া ৯০০ টাকা, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ট্রাক-পিকআপে জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। এছাড়াও ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ভাড়ার এই হার প্রতিদিন বাড়ছে।
পর্যবেক্ষণকালে দেখা গেছে, ৫২ আসন বিশিষ্ট লোকাল বাসও ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ভিন্ন হলেও অসাধু পরিবহন মালিকেরা যাত্রীসাধারণের অসচেতনার সুযোগ নিয়ে ৪০ আসনের বাসভাড়া হারে ৫২ আসনের বাসেও একই হারে বাড়তি ভাড়া নিতে দেখা গেছে। সিএনজিচালিত বাস ও ডিজেলচালিত বাসের ভাড়ার হার ভিন্ন হলেও ঈদযাত্রার বহরে সবাই সমহারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চালাচ্ছে। কিছু কিছু নামী-দামী কোম্পানীর বাসে কৌশলে বাড়তি ভাড়া আদায়ের জন্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গেলে নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট নেই অজুহাত দেখিয়ে সাতকানিয়া, চকরিয়া বা বান্দরবানের টিকিট কাটতে বাধ্য করছে। একইভাবে উত্তরবঙ্গের বগুড়া গেলে রংপুর, নওগাঁ পর্যন্ত টিকিট কাটতে বাধ্য করতে দেখা গেছে। অন্যান্য রুটেও যাত্রীদের কাঙ্খিত গন্তব্য থেকে দুরের টিকিট কিনতে বাধ্য করতে দেখা গেছে।
সরকার বাস-লঞ্চ ও বিভিন্ন গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণকালে চালক-সহকারী ও ভাড়া আদায়কারীর বেতন-ভাতা ও দুই ঈদের বোনাস প্রতিদিনের আদায়কৃত ভাড়ায় ধার্য থাকলেও দেশের কোনো পরিবহনের মালিক তা পরিশোধ করেন না—পর্যবেক্ষণকালে বাসের চালক-সহকারীর সাথে কথা বলে এ তথ্য পেয়েছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি। সংগঠনটি বলছে, দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতি, ঈদকেন্দ্রিক পরিবহনে চাঁদাবাজি বৃদ্ধি, পরিবহন কোম্পানিগুলোর বাড়তি খরচের জোগান দেয়া, পরিবহনের মালিক-চালক-সহকারী ও অন্যান্য সহায়ক কর্মচারীদের ঈদ বোনাস তুলে নেয়া। পরিবহন মালিকেরা বাড়তি মুনাফা লুফে নেয়াসহ নানাকারণে বিভিন্ন শ্রেণির গণপরিবহন ও ভাড়ায় চালিত প্রাইভেট পরিবহনগুলো একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। সড়ক ও নৌ পথের পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতা নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় মনিটরিং ভিজিল্যান্স টিমে যাত্রী সংগঠন না রাখায় এমন নৈরাজ্য থামাতে যাত্রীস্বার্থ দেখার কেউ নেই।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে দুরপাল্লার রুটে বাস-মিনিবাসে ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াতে ৮৭ শতাংশ যাত্রীপ্রতি টিকিটে গড়ে ৩৫০ টাকা হারে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সেই হিসেবে এবারের ঈদে দুরপাল্লার যাত্রীদের ১২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সিটিবাসে ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর ৮৭ শতাংশ যাত্রী প্রতি টিকিটে গড়ে ৫০ টাকা হারে বাড়তি দিলে ২৬ কোটি ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে। ফলে এবারের ঈদে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা শুধুমাত্র বাস-মিনিবাসে বাড়তি ভাড়া আদায় হবে।
এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জন্য গণপরিবহনে ডিজিটাল লেনদেনে ভাড়া আদায় চালু করা, নগদ টাকার লেনদেন বন্ধ করা, সড়ক-মহাসড়কে সিসি ক্যামরা পদ্ধতিতে প্রসিকিউশন চালু করা ও আইনের সুশাসন নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি।







