আবরার ফাহাদকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল এবং বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান উদ্দীন। তিনি বলেন, আবরারের শহীদ হওয়া এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশের সুশীল ও বামপন্থীরা অস্বস্তিতে ভুগছেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব কথা লেখেন তিনি।
রায়হান উদ্দীন লেখেন, “শহীদ আবরার ফাহাদকে শিবির ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই আলাপটা সূক্ষ্মভাবে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কেন করা হয়েছে সবাই জানেন! একজন আবরার ফাহাদের শহীদ হওয়া এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশের সুশীল ও বামরা কি পরিমাণ অস্বস্তিতে ভুগে সেটা গত বছরও আমরা দেখেছি।”
তিনি বলেন, “আবরার শহীদ হওয়ায় হয়তো পুরো পৃথিবী দেখেছে ক্যাম্পাসে শিবিরের সাথে কেমন আচরণ করা হয়েছে। শিবিরের অসংখ্য ভাইদের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আধমরা করে ৪/৫ তলা থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সারারাত পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, তাদেরকে নিয়ে কেউ কথা বলেনি। কারণ, তারা শিবির!
অর্থাৎ, কাউকে হত্যা করাটা অপরাধ হলেও শিবির হত্যা করাটা ছিলো উদযাপনের বিষয়। বাংলাদেশের বাম, সুশীল ও আওয়ামী লীগ একযোগে এই হত্যাকে সেলিব্রেট করতো।”
রায়হান উদ্দীন লেখেন, “২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর ভোরে বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অসম চুক্তি এবং পানি আগ্রাসন নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এরপর শিবির সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্মমভাবে তাকে পেটানো হয়। শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে ফেলে রেখে পালিয়ে যান নির্যাতনকারীরা। খবর পেয়ে পুলিশ বুয়েটের শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে আবরারের লাশ উদ্ধার করে।”
তিনি লেখেন, “দেশজুড়ে তোলপাড় হওয়া সেই ঘটনায় করা মামলা বিচারিক আদালতের পর নিষ্পত্তি হয়েছে হাইকোর্টেও। তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় ৭ বছরেও রায় কার্যকর করা যাচ্ছে না। আপিল নিষ্পত্তি করে দ্রুত আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছে বাদীপক্ষ।”
রায়হান উদ্দীন উল্লেখ করেন, “মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনার কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেছেন, ‘আমরা কোনো মামলায় বিলম্ব ঘটাতে চাই না। এই মামলা যখনই শুনানি শুরু হবে আমরা কোনো মুলতবি চাইব না। মানুষ দেখতে চায়, রায় দ্রুত কার্যকর হয়েছে। রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে একটি বার্তা যাওয়া উচিত যে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে ভিন্নমতের ব্যক্তিদের ওপর এমন নির্মম ঘটনা যাতে কেউ ঘটানোর সাহস না পায়।’”
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, “ওই ঘটনায় তার বাবা চকবাজার থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ২৫ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ওই মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।”
রায়ে আদালত বলেছিলেন, “আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে শিবির সন্দেহে আবরার ফাহাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে আর কখনো না ঘটে সে জন্য সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য নথিপত্র ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। পাশাপাশি রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল ও নিয়মিত আপিল করেন আসামিরা। শুনানি শেষে গত বছরের ১৬ মার্চ বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট। পরে ৩ মে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে আপিল বিভাগে আবেদন করেন আসামিরা।
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের বিলম্ব বা মুলতবি চাইবে না।







